পৃথিবীর আশ্চর্যময় ১০টি জাদুঘর
আমরা অনেকেই বিভিন্ন সময়ে জাদুঘরে গিয়েছি। আজকে আমরা পৃথিবীর এমন ১০ টি আজব জাদুঘর সম্পর্কে জানবো যেসব জাদুঘর সম্পর্কে আপনি তেমন কথা শুনেন নি।
ইংরেজীতে Museum যার অর্থ দাঁড়ায় জাদুঘর। যে ঘর জাদুময়, তাই জাদুঘর। ভাবছেন, কী বললাম? খুব ছোটবেলায় তাই মনে করতাম। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে জাদুঘর কী? শুধু কি রাজা রানীদের ছবি, গহনা-অলংকার? মোটেও না, জাদুঘর যেকোনো কিছুর সংগ্রহশালা হতে পারে। আজকে তাই, পৃথিবীর আজব কয়েকটা জাদুঘরের সাথে পরিচয় করিয়ে দিবো। আর এসব আশ্চর্যময় জাদুঘর সম্পর্কে জানাচ্ছেন – প্রত্যয় বৈদ্য ।
১. ইন্টারনেশনাল স্পাই মিউজিয়াম
গুপ্তচরবৃত্তি শব্দটার সাথে কমবেশি সবাই পরিচিত। আমরা নিশ্চয়ই জেমস বন্ডের মুভি সিরিজগুলোতে দেখেছি বিভিন্ন গ্যাজেট। বাস্তবেও বিভিন্ন ধরনের গ্যাজেট আছে, যা যেকোনো মিশনে গুপ্তচররা ব্যবহার করে। এসব বিভিন্ন ধরনের গ্যাজেট এবং আইডিয়া নিয়ে ওয়াশিংটন ডি.সি. তে একটি জাদুঘর গড়ে উঠেছে, যার নাম ইন্টারন্যাশনাল স্পাই মিউজিয়াম। বিশ্বজুড়ে গুপ্তচর দ্বারা ব্যবহৃত সরঞ্জাম এবং উদ্ভাবন, যেমনঃ লিপস্টিক পিস্তল, সেইসাথে সিনেমার গ্যাজেট, ক্র্যাকিং কোড, স্পটিং জালিয়াতি প্রভৃতি প্রদর্শন করা হয় দর্শকদের কাছে।
২. মেগুরো প্যারাসাইটোলজিক্যাল মিউজিয়াম
নাম শুনেই বুঝতে পারছেন যে, এখানে প্যারাসাইট অর্থাৎ পরজীবী নিয়ে সব সাজানো। এই মিউজিয়ামটি জাপানে অবস্থিত। মিউজিয়ামটিতে অনেকের গা শিরশিরিয়ে উঠতে পারে। তবে আপনার জীববিজ্ঞান পছন্দ হলে জায়গাটি হতে পারে খুবই চমকপ্রদ। বিশ্বের দীর্ঘতম টেপওয়ার্ম প্রায় ২৯ ফুট লম্বা সহ প্রায় ৩০০ টিরও বেশি পরজীবীর নমুনা মিউজিয়ামটিতে রয়েছে। সারির পর সারি করে সাজানো সব পরজীবী দেখার পর বুঝতে পারবেন কত বিস্ময়কর এ পৃথিবী।
৩. দ্যা ন্যাশনাল মিউজিউয়াম অব ফিউন্যারল হিস্ট্রি
২৫ বছর ধরে, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পরিচালক রবার্ট এল. ওয়াল্ট্রিপ মৃত্যুর শেষকৃত্য ইতিহাসের জন্য নিবেদিত একটি জাদুঘর বানানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং ১৯৯২ সালে তার এই স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হয়েছিল। এই জাদুঘরটি অবস্থিত হুস্টোন, টেক্সাসে। এই জাদুঘরে রয়েছে ভিনটেজ জানাজার কোচ, কাস্টম কফিন, সেন্ট জন পল (দ্বিতীয়) দ্বারা ব্যবহৃত পোপমোবাইল (পোপমোবাইল একটি বিশেষভাবে ডিজাইন করা মোটর গাড়ি যা জনগণের উপস্থিতির সময় ক্যাথলিক চার্চের পোপ দ্বারা ব্যবহৃত হয়) এবং আরো রয়েছে ঘানা সহ বিভিন্ন দেশের কফিনের নিদর্শন। সেখানকার প্রদর্শনের বিষয়গুলির মধ্যে বিশ্বজুড়ে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া রীতিনীতি এবং কৌশলগুলি অন্তর্ভুক্ত।
৪. মিউজিয়াম অব ব্রোকেন রিলেশনশিপ
একটি রিলেশনশিপের মধ্যে অনেকধরনের স্মৃতি থাকে। কারণে অকারণে, অভিমানে-ক্ষোভে যেকোনো ভালবাসার সম্পর্কে ঘুন ধরতে পারে। হারিয়ে যেতে পারে ভালোবাসার সেইসব মানুষগুলো। কিন্তু হারায় না তাদের সাথে থাকার মুহূর্তগুলো। এই মুহূর্তগুলোকে আরো স্মরণীয় করতে গড়ে উঠেছে এই মিউজিয়ামটি। ২০০৬ সাল থেকে এই মিউজিয়ামটি হয়ে উঠেছে ভেঙে যাওয়া ভালোবাসাগুলোর ঘর, যার ঠিকানা ক্রোয়েশিয়ার জাগ্রেব শহরে। এখানে মূলত প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরে প্রেমিক প্রেমিকার ব্যবহৃত জিনিসগুলি সংগ্রহ করে সজ্জিত করা হয়েছে। এই জিনিসগুলি আসে দানের মাধ্যমে এবং যে দাতা, তাকে তার জিনিসটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করার জন্য একটি নোটও দেওয়া হয়। মিউজিয়ামটিতে চোখের অশ্রুর ছোট শিশি থেকে বিয়ের পোশাক কিছুই যেন বাদ যায় না। মিউজিয়ামটিতে ঘুরে আসলে বুঝতে পারবেন প্রেম কি জীবন না স্মৃতি!
৫. ইউএফও মিউজিয়াম
UFO যার পূর্ণরূপ করলে দাঁড়ায় Unidentified Flying Object। এখন পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে গোল চাকতির মতো কোনো উড়ন্তযান দেখেছেন দাবী অনেকের এবং এই দাবী থেকে গড়ে উঠেছে এই জাদুঘর। এলিয়েন সম্পর্কিত নানা চমকপ্রদ তত্ত্ব এখানে উন্মোচন করা হয়েছে। আমেরিকার অত্যন্ত সিকিউরিটি অঞ্চল “এরিয়া 51” নিয়ে নানা বিষয়বস্তু, ইউএফও দর্শন, অবতরণের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে এই জাদুঘরে। জাদুঘরটি অবস্থিত রোজওয়েল, নিউ মেক্সিকোতে।
৬. প্লাস্টিনেরিয়াম জাদুঘর
এই জাদুঘর সম্পর্কে জানার আগে আমাদের বুঝতে হবে প্লাস্টিনেশন কী? প্লাস্টিনেশন হল দেহের অঙ্গ সংরক্ষণের জন্য একটি কৌশল বা প্রক্রিয়া। এটি প্রথমে ১৯৭৭ সালে গুন্থার ফন হেগেনস নামে এনাটমিস্ট উদ্ভাব্ন করেছিল। এই কৌশলে শরীরের জল এবং চর্বিকে নির্দিষ্ট প্লাস্টিক দ্বারা প্রতিস্থাপিত করা হয়। এই নমুনাগুলি স্পর্শ করা যায়, কোনো রকম গন্ধ বা ক্ষয় হয় না এবং এমনকি মূল নমুনার বেশিরভাগ বৈশিষ্ট্য ধরে রাখে। আর এই সকল নমুনা নিয়ে গড়ে উঠেছে প্লাস্টিরেনিয়াম জাদুঘরটি যার অবস্থান জার্মানির গুবেনে। এই জাদুঘরকে বলা যায়, সংরক্ষিত মৃতদেহের প্রদর্শনী। প্রায় ১৮০০০ এরও বেশি ব্যক্তি তাদের দেহ দান করেছেন ভ্যান হেগেন্সকে। জাদুঘরের দর্শনার্থীরা জানতে পারে বিজ্ঞানীরা কীভাবে দেহগুলি ছিন্ন ও সংরক্ষণ করে। এছাড়া চামড়াবিহীন দেহ, মানবদেহের বিভিন্ন অংশ এবং জিরাফের মতো প্রাণীর দেহের বিভিন্ন প্রদর্শন দর্শনার্থীরা দেখতে পান।
৭. আন্ডারওয়াটার মিউজিয়াম অব আর্ট
পানির নিচে জাদুঘরের কথা কখনও শুনেছেন? মেক্সিকোর ক্যানকুনের আশেপাশের জলের দিকে যাত্রা করার সময়, নির্দ্বিধায় উদ্ভাবকরা একরকম এক জাদুঘর দেখে আসতে পারেন। মিউজিয়ামটি গড়ে উঠেছে সমুদ্রের তলদেশে, যেখানে ৫০০ টিরও বেশি ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। এগুলি এমন উপাদান থেকে তৈরি যা সামুদ্রিক প্রবালগুলিকে তাদের মত করে বাড়তে দেয়। এইভাবে, শিল্পটি হয়ে ওঠে জীবন্ত এবং এই ভাস্কর্যগুলি তাদের পরিবেশের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়।
৮. মিউসো দ্য লাস মমিয়াস দ্য গুয়ানাজুয়াতো
১৮৬০ এর দশকে ছোট্ট মেক্সিকান শহর গুয়ানাজুয়াতোতে একসময় এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছিল। তখনকার উচ্চ প্রশাসন শহরটিতে তাদের প্রিয়জনকে কবর দেওয়ার জন্য কর কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। যখন অসহায় পরিবারগুলি করের অর্থ দিতে ব্যর্থ হয়েছিল, তাদের পরিবার প্রিয়জনের মৃতদেহগুলো পড়েছিল কোনো সৎকার ছাড়া। পরবর্তী শতাব্দীতে দেহগুলি যখন উদ্ধার করা হয়, দেহগুলো ততোদিনে প্রাকৃতিকভাবে মমিতে পরিণত হয়েছিল। আর এই মমিগুলির একটি সংগ্রহশালাতে জায়গা হয়, যার নাম হয় মিউসো দ্য লাস মমিয়াস দ্য গুয়ানাজুয়াতো।
৯. ইন্টারন্যাশনাল ক্রিপ্টোজুলজি মিউজিয়াম
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ বড় শহরগুলিতে সাধারণত চিড়িয়াখানা রয়েছে, কিন্তু পোর্টল্যান্ডের মেইন বিশ্বের একমাত্র স্থান যেখানে একটি ক্রিপ্টোজুলজি জাদুঘর রয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো – ক্রিপ্টোজুলজি কী? এটি এমন এক বিষয় যা ডাইনোসর ছাড়াও লচ নেস দৈত্য (অতিকায় বিশালদেহী), বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীদের অস্তিত্ব প্রমাণ করার চেষ্টা করে। প্রতিষ্ঠাতা লরেন কোলম্যানের তার এই ক্রিপটিভ সংগ্রহে নানা প্রাণির পায়ের ছাপ এবং চুলের নমুনার পাশাপাশি বিজ্ঞানের দ্বারা স্বীকৃত নয় এমন বিখ্যাত এবং অস্পষ্ট প্রাণীগুলির নমুনা এবং প্রতিলিপিগুলি রয়েছে।
১০. মিউজিয়াম অব মিনি নেচার বুকস
আজারবাইজানের বাকু পৃথিবীর বিরলতম স্থান কারণ এখানে রয়েছে বিশ্বের একমাত্র ক্ষুদ্র বইয়ের জাদুঘর। জারিফা সালাহোভা নামে ব্যক্তি এই সংগ্রহটি ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সংকলন করেছিলেন এবং ২০০২ সালে এটি খোলার পর থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের বই প্রেমীদের অনুদানের দ্বারা এ সংকলন আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। জাদুঘরটিতে প্রায় ৬৬টি দেশের প্রকাশিত ৫,৬০০ টিরও বেশি বিভিন্ন বই রয়েছে। এমনকি এখানে রয়েছে কোরআনের ১৭ শতকের অনুলিপি। এই জাদুঘরে গেলে ম্যাগনিফাইং গ্লাস নিতে ভুলবেন না, কারণ এর দ্বারা পড়তেন পারবেন বিশ্বের ক্ষুদ্রতম বইগুলো।
আশা করি যে, আজকের এই লেখাটি পড়ে আপনারা পৃথিবীর আশ্চর্যময় ১০ টি জাদুঘর সম্পর্কে ভালোই ধারণা পেলেন। তাহলে, কবে যাচ্ছেন এসব জাদুঘর দেখতে?

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন