বার্লিন শহরটি বর্তমানে জার্মানির রাজধানী ও একটি রাজ্য। ইতিহাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর স্নায়ুযুদ্ধসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাই জড়িত বার্লিন প্রাচীরকে ঘিরে। বার্লিন শহর জার্মানির মধ্যবর্তী একটি শহর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানিকে যখন পূর্বে-পশ্চিমে বিভক্ত করা হয় তখন বার্লিনের বুক চিঁড়ে দুই জার্মানির সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হয় ইতিহাসে যা বার্লিন প্রাচীর নামে পরিচিত। জার্মানি বিভক্তের
পেছনে রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস যার সাথে জড়িয়ে রয়েছে এই বার্লিন প্রাচীর।
বসনিয়ার রাজধানী সারায়োভোতে অস্ট্রিয়ার যুবরাজ ফার্ডিনান্ড সার্বিয়ান একজনের হাতে নিহত হয়। অস্ট্রিয়া এ হত্যাকান্ডের জন্য সার্বিয়াকে দায়ী করে সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ যোঘণা করে। অস্ট্রিয়া যুদ্ধ ঘোষণা করায় তার সহোযোগী দেশগুলো হয় কেন্দ্র শক্তি আর যুদ্ধে সার্বিয়াকে সাহায্যকারী দেশগুলো হয় মিত্র শক্তি, ইতিহাসে এই যুদ্ধ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ নামে পরিচিত।
যুদ্ধে মিত্র শক্তির জয় হয়, ফলে কেন্দ্র শক্তিতে অবস্থান নেয়া দেশগুলোকে মাশুল গুনতে হয়। কেন্দ্র শক্তির অন্যতম শক্তিশালী দেশ ছিলো জার্মানি, ফলে তাকে দিতে হয় অনেক ক্ষতিপূরণ। প্রথম ভার্সাই চুক্তি বা শান্তিচুক্তি যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মিত্রশক্তি এবং জার্মানির মধ্যে সম্পাদিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে জার্মানির রাষ্ট্রীয় সীমানা শতকরা দশভাগে কমিয়ে আনা হয়। জার্মানিকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, যা জার্মানির জন্য ছিলো খুবই অপমানকর। তাছাড়া মিত্রশক্তির দেশসমূহে সংঘটিত জীবন, অর্থ ও অবকাঠামোগত সকল ক্ষয়ক্ষতির জন্য জার্মানিকে দায়ী করা হয়। জার্মানি এই ব্যয়বহুল ক্ষতিপূরণের অংশবিশেষ ১৯৩১ সালে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পরিশোধ করে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যুদ্ধাপরাধী হওয়া এবং ক্ষতিপূরণ দেয়ার পাশাপাশি সীমানা সংকুচিত হওয়া এসকল কারণে জার্মানি ছিলো ক্ষুব্ধ ফলে শক্তি প্রর্দশণের জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। এমন অবস্থায় ১৯৩৩ সালে ক্ষমতায় আসে জার্মানির নতুন চ্যান্সেলর হিটলার। তার আর্দশ ছিলো যুদ্ধই জীবন, যুদ্ধই সার্বজনীন। সমগ্র বিশ্ব থেকে জার্মানি যখন কোণঠাসা হয়ে পড়লো ঠিক তখনই জার্মান জাতীয়তাবাদের এই প্রবাদ পুরুষের জন্মই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম কারণ হয়ে যায়। ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর জার্মানি পোল্যান্ডের ডানজিগ সমুদ্রবন্দর আক্রমণ করে, ফলে বেঁধে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
জার্মানি যুদ্ধে জড়ানোর কারণে অক্ষশক্তি হয় জার্মানির পক্ষে থাকে ইতালি ও জাপান। অন্যদিকে পোল্যান্ড, ব্রিটেন, ফ্রান্স, সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও বেলজিয়াম মিলে হয় মিত্রশক্তি। যুদ্ধে মিত্রশক্তির জয় হয় ফলে মিত্রশক্তির হাতে জার্মানি চার খন্ডে বিভক্ত হয়ে পড়ে আর তা শাসন করে ‘বিগ ফোর’ বা পরাশক্তি বিট্রেন, যুক্তরাষ্ট্র, ফান্স ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। জার্মানির চার অংশ কার্যত দুভাগে বিভক্ত হয়। জার্মানির পূর্বাংশে সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠন করে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব জার্মানি আর পশ্চিমাংশে ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ফান্স মিলে গঠন করে ফেডারেল রিপাবলিক অব জার্মানি। জার্মানি ভাগের সময় বার্লিন শহরটি সোভিয়েতের অংশে থাকলেও শহরটিকে দুই ভাগ করা হয়। পশ্চিম জার্মানি তথা যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের অধীকৃত অংশে চলে পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থা অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশে চলে সমাজতান্ত্রিক অর্থ ব্যবস্থা।
১৯৩৯ সালে জার্মানি পূর্ব-পশ্চিম দুভাগ হলেও ১৯৫২ সাল পর্যন্ত সেখানে ছিলো অবাধ চলাচল। পুঁজিবাদী পশ্চিম জার্মানি অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠায় পূর্ব থেকে পশ্চিমে অভিবাসী হওয়ার সংখ্যাটা বাড়তে থাকে। ১৯৫২ সালের পর থেকে আস্তে আস্তে যাতায়াতে নিষেধাজ্ঞা জোড়ালো হতে থাকে। সরকারী হিসেবে, ১৯৬১ সালে পূর্ব থেকে পশ্চিমে যাওয়ার সংখ্যাটা হয় সবচেয়ে বেশি। ফলে ঐবছরই ১২-১৩ আগস্ট রাতের আঁধারে পূর্বজার্মানি পশ্চিমের পুঁজিবাদী ধাক্কা সামলাতে দুই বার্লিনের সীমানায় কাঁটাতারের বেড়া দেয়। বার্লিন শহরে পূর্ব পশ্চিমে যাতায়াতের মূল পয়েন্টগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। এক রাতের ব্যবধানে বার্লিনবাসী পরদিন সকালে উঠে দেখলো পরিবার ও প্রতিবেশী থেকে পৃথক হয়ে গেছে। পরবর্তীতে সেই কাঁটাতারের বেড়ায় সোভিয়েত সৈন্যদের প্রহরায় গড়ে ওঠে ১৫৫ কিমি দীর্ঘ ও ১৩ ফিট উচু প্রাচীর যা বার্লিনকে পূর্ব-পশ্চিমে বিভক্ত করে। প্রাচীরটি করা হয় পূর্ব জার্মানির সীমানায় ১০০ গজ জায়গা রেখে আর সেই ১০০ গজকে বানানো হয় নোম্যান্সল্যান্ড। নোম্যান্সল্যান্ড হওয়ায় জায়গাটি ছিলো ফাঁকা স্থান ফলে কেউ পালাতে চাইলে স্পষ্ট দেখা যেতো, সীমান্ত রক্ষীরা গুলি করতো। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, পূর্ব থেকে পশ্চিমে যাওয়ার চেষ্টাকালে ১২৫ জন প্রাণ হারায়। আর বেসরকারী হিসাবে এ সংখ্যাটি প্রায় ২০০।
প্রাচীরের কারণে বার্লিনের পরিবহন ব্যবস্থাও দুইভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। রেলপথে পশ্চিম থেকে আসা কোন ট্রেন পূর্বের কোন ষ্টেশনে থামতে পারতো না। মানুষশূন্য হয়ে যাওয়ায় স্টেশনগুলো নীরব ও ভূতুড়ে হয়ে যায় ফলে এগুলোকে ভূতুড়ে স্টেশন (গেস্টারবানহোফ) বলা হতো। একটু একটু করে জার্মানিবাসী নিজ দেশে পরবাসের মতো হয়ে যেতে থাকলো। ১৯৬১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত জার্মানির বার্লিন শহরের বুক চিড়ে দাঁড়িয়ে ছিল এই সীমানা প্রাচীর। ১৯৬১-১৯৮৯ সাল পর্যন্ত সীমানা প্রাচীর ঘিরে গড়ে ওঠে ৩০২টি ওয়াচ টাওয়ার। দীর্ঘ ২৮ বছরের ইতিহাসে প্রাচীর টপকাতে গিয়ে সৈন্যদের গুলিতে নিহত হয় শতাধিক মানুষ। ফলে পূর্ব জার্মানিতে শুরু হয় পশ্চিম জার্মানি ভ্রমণে বা যাতায়াতে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার জন্য আন্দোলন। নাগরিক আন্দোলনের ডাকে ১৯৮৯ সালের ৯ অক্টোবর পূর্ব জার্মানির লাইপজিগে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ রাস্তায় নামে এবং ৪ নভেম্বর পূর্ব বার্লিনের আলেক্সান্ডা স্কয়ারে প্রায় ১০ লাখ মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করে।
ফলে ৯ নভেম্বর পূর্ব জার্মানি সরকার বাধ্য হয়ে ঘোষণা দেয় যে, এখন থেকে পূর্ব জার্মানির নাগরিকরা বিনা বাঁধায় পশ্চিম জার্মানি ভ্রমণ করতে পারবে। তবে কিছু নিষেধাজ্ঞা রয়েছে তা স্পষ্ট করা হয়নি। এই ঘোষণাকে পশ্চিম জার্মানি গণমাধ্যম প্রচার করে বার্লিন সীমান্ত উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। টেলিভিশনে ঘোষণার পর দেয়ালের উভয় পাশে জড়ো হতে থাকে হাজার হাজার মানুষ। চেকপোস্টের সৈন্যরা জনতার স্রোত সামলাতে না পেরে সীমান্ত খুলে দেয় অপরপাশে হাজার হাজার পশ্চিম বার্লিনবাসী উৎসবমুখর পরিবেশে তাদের স্বাগত জানায়। এভাবে ৯ই নভেম্বর, ১৯৮৯ অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রাচীরের পতন হয়। আনন্দে উদ্বেলিত জনগণ আবার কেউ কেউ কান্নায় ভেঙে পড়েন, এতো বছর পর দীর্ঘদিনের না দেখা বন্ধু-স্বজন কারো পরিবার-প্রতিবেশী আবার কারো ফেলে আসা অতীতকে ফিরে পেয়ে। সেদিনের সেই দৃশ্য দেখে পৃথিবীর সমগ্র মানুষ পুলকিত হয়েছিলো। বিভেদের দেয়াল ভেঙ্গে যাওয়ায় বার্লিন প্রাচীরের উপর অনেকগুলো কনসার্ট হয় তার অন্যতম একটি গান ছিলো লোল ‘লুকিং ফর ফ্রিডম’ এটি জার্মানিতে তখন ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
বার্লিন প্রাচীর পতনের মাত্র ১১ মাস পর আনুষ্ঠানিক ভাবে ১৯৯০ সালের ৩ অক্টোবর একীভূত হয় দুই জার্মানি এবং ৩০ অক্টোবর গঠিত হয় নতুন জার্মানি রাষ্ট্র। পুঁজিবাদ আর সমাজতন্ত্রের যে দেয়াল একটা দেশকে করেছিলো দুভাগে বিভক্ত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক দুরত্ব তৈরী করেছিলো তা নিমিষেই জাতীয়তাবাদের কাছে হেরে গেলো। মূলত প্রাচীরটি ছিলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর স্নায়ুযুদ্ধের একটি প্রতীক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব হয়ে পড়ে দুই ভাগে বিভক্ত। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে পুঁজিবাদী-সমাজতান্ত্রিক যে দ্বন্দ্ব যুক্তরাষ্ট্র-সোভিয়েত কে ঘিরে চলতে থাকে, এই দ্বন্দ্বের সময়ে বিভিন্ন জোট বা সংগঠন গড়ে ওঠা এবং যুদ্ধ যুদ্ধ অবস্থা বিরাজ করা তা বার্লিন প্রাচীরের সাথে আস্তে আস্তে বরফের মতো গলতে শুরু করে। জার্মানি ছিলো সেই স্নায়ুযুদ্ধের কেন্দ্র আর তার প্রতীক ছিলো এই বার্লিন প্রাচীর। বার্লিন প্রাচীরের পতনের মধ্য দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙ্গার গতি আরো জোরদার হয়।
বার্লিন প্রাচীরকে ধরা হয় পূর্ব ইউরোপে অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণে থাকা রাষ্ট্রগুলোর সমাজতন্ত্র পতনের চিহ্ন হিসেবে। তাই বার্লিন প্রাচীর শুধু প্রাচীরই নয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পরাশক্তিদের কাছে পৃথিবী আবার জিম্মি হতে শুরু করেছিলো তার নিদর্শন। দুই জার্মানি এক হলেও ১৯৩৯-১৯৯০ পর্যন্ত জাতীয় জীবনে যে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পার্থক্য গড়ে ওঠে জার্মানি তার ভয়াবহ প্রভাব আজও সম্পূর্ণ কাটিয়ে উঠতে পারেনি। পূর্ব জার্মানির নাগরিকরা রাতারাতি যে জীবনমানের আশা করেছিল তা এখনো পর্যন্ত সমতা লাভ করনি। দুই জার্মানির নাগরিকদের মধ্যে সম্পদের যে বৈষম্য তৈরি হয়েছিল, তা এখনও বিদ্যমান। মনস্তাত্ত্বিক যে পার্থক্য তৈরী হয়েছিলো তা এখনো রয়েছে মানুষের জীবনে ফলে বলা হয়, বার্লিন প্রাচীর ভেঙেছে ঠিকই কিন্তু মানসিক প্রাচীর এখনও রয়ে গেছে। ২০০৪ সালের এক জরিপে দেখা যায় শতকরা ২৫ ভাগ পশ্চিম বার্লিনবাসী এবং ১২ ভাগ পূর্ব জার্মানিবাসী প্রাচীরের অস্তিত্ব এখনও চায়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন