
পশ্চিম আফ্রিকার ভূমি বেষ্টির দেশ মালি
বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র মহাদেশ হিসেবে আফ্রিকার পরিচিতি। যেখানে ধনীর চেয়ে গরিবের সংখ্যাই বেশি। মালি পশ্চিম আফ্রিকার একটি রাষ্ট্র। এর রাজধানীর নাম বামাকো। মালি বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত। মানুষের গড় আয়ু এবং স্বাক্ষরতার হার সেখানে বিপজ্জনকভাবে কম।
| President Bah N'Daw, right, and Vice-President Assimi Goita, left, in Bamako, Mali, Friday, Sept. 25, 2020. |
গোত্রভিত্তিক কোন্দলকে কেন্দ্র করে মালির উত্তরাঞ্চলে তুয়ারেগ গোত্রের বিদ্রোহ দেশটিকে দুভাগে বিভক্ত করার ঝুঁকির মুখে ফেলেছে, যার কারণে মালি সাম্প্রতিক বিশ্ব খবরেও উঠে এসেছে। কিন্তু মালির জীবন সবসময়ই এমন নেতিবাচক বা হতাশায় পরিপূর্ণ ছিলনা। একসময় মালি ছিল একটি সফল মুসলিম রাষ্ট্রের উজ্জ্বল উদাহরণ। ছিল বিশ্ববাসীর কাছে ঈর্ষার বস্তু। সত্যিই দেশটা ছিল যেন মরূভূমিতে এক স্বর্ণের খনি।
বামাকোর লোকসংখ্যা ১০ লাখের উপরে। মালির মুদ্রার নাম সেফা। এক ডলারের মূল্যমান ৬০০ সেফার সমান। ১৯৬০ সালে মালি স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৯১ সালে মালি স্বৈরাসন থেকে মক্ত হয় এক সেনা অভ্যুত্থান। মালির অধীকাংশ মানুষ ইসলাম ধমাবালী। স্বর্ণ ও লবণের খনি শত শত বছর ধরে মালির অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করছে। প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম বোওবাকার কিয়েতা। প্রধানমন্ত্রী মদিবো কিয়েতা। মালির আয়তন ৪ লাখ ৭৮ হাজার ৮৩৯ বঃ মাঃ। লোকসংখ্যা ১ কোটি ৪৫ লক্ষ ১৭ হাজার ১৭৬ জন। শিক্ষিতের হার ২৭%-৪৬%।
মালি পশ্চিম আফ্রিকার একটি রাষ্ট্র। এর রাজধানীর নাম বামাকো। পশ্চিম আফ্রিকার এই বড় দেশটির উত্তরে প্রায় অর্ধেক জুড়ে রয়েছে সাহারা মরুভূমি। দেশের বাকি অংশ জুড়ে রয়েছে সবুজ তৃণভূমি। গরিব কৃষি ভিত্তিক দেশটিতে বিভিন্ন সময়ে খরায় বহু মানুষ ও প্রাণীর মৃত্যু হয়েছে। দেশের অধিকাংশ মানুষ কৃষ্ণকায় আফ্রিকি, তাদের বাস গ্রামাঞ্চলে, জীবিকা কৃষিকাজ ও পশুপালন। মালিতে বহু খনিজ পদার্থ থাকলেও তার ব্যবহার খুব অল্প। ৩০০০ থেকে ১৫০০ অব্দ পর্যন্ত দেশটি আফ্রিকার তিনটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য ঘানা, মালি ও সোঙ্গাই সাম্রাজ্যের অংশ ছিল।
| The Administrative Park in Mali’s capital, Bamako, in which the Ministry of Justice is located, |
দেশটির উত্তরে প্রায় অর্ধেক জুড়ে রয়েছে সাহারা মরুভূমি। দেশের বাকি অংশ জুড়ে রয়েছে সবুজ তৃণভূমি। মালিতেই ছয় হাজার ফরাসি নাগরিক বাস করছে। মালি বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত। মানুষের গড় আয়ু এবং স্বাক্ষরতার হার সেখানে বিপজ্জনকভাবে কম। মালির উত্তরে মধ্য সাহারা, দক্ষিণ অংশে রয়েছে নাইজার এবং সেনেগাল নদী। প্রধান পেশা কৃষি ও মৎস চাষ। প্রধান খনিজ পদার্থ স্বর্ণ। মালির ৬৮% অধিবাসী গ্রামে বাস করে। মালিতে জন্ম হার ১০০০ জনে ৪৫.৫৩ জন। প্রত্যেক বিবাহিত নারীর গড় সন্তান সংখ্যা ৬.৫ জন। মৃত্যু হার ১৬.৫ প্রতি হাজারে। গড় আয়ু ৫৩.০৬ বছর । শিশু মৃত্যুর হার অত্যধিক। হাজারে ১০৬ জন।
১৮৯৫ থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত ফরাসিদের অধিকারে ছিলো দেশটি। ১৯৬০ সালে মালি স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৯১ সালে মালি স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত হয় এক সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। ১৯৯২ সালে অনুষ্ঠিত হয় গণতান্ত্রিক নির্বাচন। মালির অধিকাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মাবলম্বী। ২০১১ সালে থেকে দেশের উত্তর প্রান্তে তুয়ারেগ জাতি গোষ্ঠীর বিদ্রোহ দেখা দেয়। বিদ্রোহ দমনে সরকারি ব্যর্থতার অভিযোগে মাঝা্রি পদের কিছু সেনা ২০১২ সালের ২২ মার্চ রাষ্ট্রপতি আমাদো টোরেকে ক্ষমতাচ্যূত করে সামরিক শাসন জারি করে। ইকনমি কমিউনিটি অব ওয়েস্ট আফ্রিকান স্টেটস'এর মধ্যস্থতায় এপ্রিল মাসে অসামরিক শাসন পুনর্বহাল হয়, অন্তর্বর্তী রাষ্ট্রপতি হন ডিওনকোন্ডা ট্রারোরে।
অভ্যুত্থান পরবর্তী বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দেশের উত্তর প্রান্তের তিনটি অঞ্চল অধিকার করে নেয় বিদ্রোহীরা। ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে অঞ্চলগুলি পুনর্দখলে অভিযান শুরু করে সেনাবাহিনী। দেশে নির্বাচন হওয়ার কথা ২০১৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে।
আধুনিক মালির অধিকৃত অঞ্চলগুলির ইতিহাস আলোচনা করতে গেলে, ইতিহাসকে কয়েকটি পর্যায়েভাগ করা যেতে পারে:
আজাদতোত্তর মালি
মালির সীমানা হ'ল ফরাসী সুদানের, ১৮৯১ সালে আঁকা মানচিত্র অনুযায়ী নির্ধারিত। এটি একটি মনুষ্যসৃষ্ট এবং কৃত্রিম সীমানা ফলস্বরূপ এটি সাহারার কিছু অংশ এবং বৃহত্তর সুদান অঞ্চল নিয়ে গঠিত। তাই মালি একটি বহুজাতিক দেশ, যদিও মান্ডে জাতির লোকজন এখানে সংখ্যাগুরু। পশ্চিম আফ্রিকা এবং মাগরেবকে সংযুক্ত করে ট্রান্স-সাহারান তেজারতে মালির ভূমিকার মালির ইতিহাসে একটি বিশিষ্ট অংশ। মালির শহর টিম্বুক্টু এই তেজারতের একটি প্রধান কেন্দ্র হিসেবে প্রাচীন কাল থেকেই গড়ে উঠেছিল। শহরটি সাহারার দক্ষিণ প্রান্তে এবং নাইজার নদীর নিকটে অবস্থিত, এটি ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে মালি সাম্রাজ্যের কায়েমের সাথে সাথে ট্রান্স-সাহারান তেজারতে জরূরী ভূমিকা পালন করেছে।
মালি সাম্রাজ্য
উনিশ শতক অবধি, মুসলিম বিশ্বের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে এবং আরব গোলাম ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে টিম্বক্টু জরূরী ছিল।
মালি সাম্রাজ্যটি সুন্দিয়া কেইতা দ্বারা কায়েম হয়েছিল এবং এর শাসকদের ধনদৌলতের সুবাদে, বিশেষত প্রথম মানসা মূসার জন্য সুপরিচিত হয়ে ওঠে। মালি সাম্রাজ্যের পশ্চিম আফ্রিকায় অনেক গভীর তামাদ্দুনিক প্রভাব ছিল, যার ফলে নাইজার দরিয়ার তীরে এর জবান, আইন এবং রীতিনীতি ছড়িয়ে পড়ে। । এটি একটি বিশাল অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত ছিল এবং বেশুমার ভাসাল রাজ্য এবং সুবাহগুলি সমন্বিত ছিল।
পঞ্চদশ শতাব্দীতে মালি সাম্রাজ্য জঈফ হতে শুরু করে, তবে তখনও এটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রভাব ধরে রেখেছিল। ষোড়শ শতাব্দীতে টিকে থাকলেও ততদিনে সাম্রাজ্য তার আগের তাকত এবং জরূরত অনেকটাই হারিয়ে ফেলে।
সোংহাই সাম্রাজ্য
মালি সাম্রাজ্য চতুর্দশ শতকের শেষ সময়ে জঈফ হতে শুরু করে। সোনহাই সম্প্রদায়ের মানুষেরা এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছিল এবং তাদের আজাদীর পক্ষে আন্দোলন শুরু করে। সোনহাইরা গাওকে তাদের রাজধানী বানিয়েছিল এবং পশ্চিম সাহেল জুড়ে তাদের নিজস্ব সাম্রাজ্যিক প্রসার শুরু করেছিল। ১৪২০ সালে, সোনহাই সাম্রাজ্য এতটাই শক্তিশালী হয়ে যায় যে তারা মাসিনা থেকে কর আদায় করতে শুরু করে। উদীয়মান সোনাহাই সাম্রাজ্য এবং পতনশীল মালি সাম্রাজ্য পরবর্তী চতুর্দশ এবং পঞ্চদশ শতকের বেশিরভাগ সময় পাশাপাশি মালি শাসন করেছে। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষদিকে, টিম্বকটুর নিয়ন্ত্রণ সোনাহাই সাম্রাজ্যের হাতে চলে যায়।
সাম্রাজ্যের বাদে (১৫৯১–১৮৯২)
শেষ পর্যন্ত মরোক্কান সাদি রাজবংশের চাপে সোনহাই সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। ১৩ই মার্চ ১৫৯১ সালের টনডিবির যুদ্ধে সোনহাই সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। পরবর্তীকালে মরোক্কো সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ অবধি গাও, টিম্বকটু, জেনেনি (জেনি হিসাবেও দেখা যায়) এবং সম্পর্কিত তেজারত রাহাগুলি খোদ নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল।
সোনহাই সাম্রাজ্যের পতনের বাদে, অঞ্চলটি কোনও একক রাষ্ট্রদ্বারা পরিচালিত হয়নি। মরোক্কানরা কেবলমাত্র দেশের কয়েকটি অংশ দখল করতে সক্ষম হয়েছিল এবং এমনকি যে জায়গাগুলিতে তারা শাসন করার চেষ্টা করেছিল, তাদের হোল্ড দুর্বল ছিল এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের দ্বারা চ্যালেঞ্জ ছিল। বেশ কয়েকটি ছোট্ট উত্তরসূরি রাজত্ব উঠেছিল। তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল:
বাম্বারা সাম্রাজ্য বা সেগৌয়ের রাজত্ব
১৭১২ থেকে ১৮৬১ সাল পর্যন্ত বামবারা সাম্রাজ্য একটি কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল; সাম্রাজ্যের মূলকেন্দ্র ছিল সেগৌ, এছাড়া টিম্বকটু ছাড়া মধ্য ও দক্ষিণ মালি অংশগুলি বাম্বারা সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। টুচলির বিজয়ী এল হাডজ উমর টাল সমগ্র পশ্চিম আফ্রিকা জুড়ে অভিযান চালানো অবধি এই সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল । উমর তালের মুজাহিদীনরা সহজেই ১৮৬১ সালের ১৮ই মার্চ সেগৌকে দখল করে বাম্বারা সাম্রাজ্যের অবসান ঘটান।
কর্তা রাজ্য
সেগৌতে কুলিবালি শাহী খান্দানের বিভক্তির ফলে ১৭৫৩ সালে দ্বিতীয় বাম্বারা রাজ্য, বা কর্তার রাজ্য কায়েম করা হয়েছিল, যা পশ্চিম মালি শাসন করত। ১৮৫৪ সালে উমর তাল এই সাম্রাজ্য দখল করে নেন।
মাসিনা
মূলত ফুলা ইনার নাইজার ডেল্টা অঞ্চলে একটি ইসলাম অনুপ্রেরিত পৃথক রাষ্ট্র কায়েম হয়েছিল ১৮১৮র সময়ে। বাদে এটি উমর টালের অভিযানের সময় বাম্বারা সাম্রাজ্যের সাথে এক হয়ে উমর টালের বিরুদ্ধে জঙ্গ করে কিন্তু ১৮৬২ সালে উমর তালের দ্বারা পরাজিত হয় ও সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে।
টাকচলিউর সাম্রাজ্য
১৮৬৪ সালে টাকচলিউর সাম্রাজ্য কায়েম করা হয়; বর্তমান মালির প্রায় পুরোটাই এই সাম্রাজ্যের অধীনস্থ ছিল; ১৮৯০ সালে ফরাসীদের হানাদারী পরিণত হওয়া অবধি এই সাম্রাজ্যের ওজুদ ছিল। রাজত্ব করেছিল।
ওয়াসোলৌ সাম্রাজ্য
ওয়াসৌলৌ বা ওয়াসুলু সাম্রাজ্য ছিল সামোরী তুরের নেতৃত্বে কায়েম করা একটি স্বল্পকালীন (১৮৭৮-১৮৯৮) সাম্রাজ্য, এটি প্রধানত মালিঙ্কা অঞ্চলে যা বর্তমানে উচ্চ গিনি এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মালি অঞ্চলে বিস্তৃত ছিল। মালি ফরাসী হানাদারী পরিণত হওয়ার বাদে এটি আইভরি কোস্ট অঞ্চলে সরে যায়।
ফ্রান্সের হানাদারী ফরাসী সুদানের অংশ রূপে মালি (১৮৯২–১৯৬০)
মালি ১৮৯২ সালে ফরাসী হানাদার শাসনের অধীনে আসে। ১৮৯৩ সালে, ফরাসীরা সুদান সহ আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে এবং এই অঞ্চলটির সৌদান ফ্রান্সেস ( ফরাসী সুদান ) নামকরণ করে একজন অসামরিক গভর্নর নিযুক্ত করেছিল। যদিও হানাদারীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ অব্যাহত ছিল, তবুও ১৯০৫ সালের মধ্যে বেশিরভাগ অঞ্চল পুরোপুরি ফরাসী নিয়ন্ত্রণে ছিল।
ফরাসী সুদান, ফরাসী পশ্চিম আফ্রিকার অংশ হিসাবে পরিচালিত হত এবং পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলে ফ্রান্সের উপনিবেশগুলিতে সস্তা শ্রমিক সরবরাহ করত। ১৯৫৮ সালে সুদানী জমহুরিয়াত সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ স্বায়ত্তশাসন লাভ করে এবং ফরাসী কওমের সাথে যোগ দেয়। ১৯৫৯ এর প্রথম দিকে, সুদানী জমহুরিয়াত সেনেগাল ও মালির ফেডারেশন গঠন করে। ১৯৬০ সালের ৩১ শে মার্চ ফ্রান্স মালির ফেডারেশনকে পুরোপুরি আজাদ হওয়ার বিষয়ে সম্মতি জানায়। ১৯৬০ সালের ২০শে জুন মালি ফেডারেশন একটি আজাদ দেশে পরিণত হয় এবং মোদিবো কেতা এর প্রথম রাষ্ট্রপতি হন।
আজাদী (১৯৬০-বর্তমান)
১৯৬০ সালের আগস্টে ফেডারেশন থেকে সেনেগাল বেরিয়ে যাওয়ার বাদে, প্রাক্তন সুদানী জমহুরিয়াত মালি জমহুরিয়াত রূপে আত্মপ্রকাশ করেছিল। ১৯৬০ সালের ২২শে সেপ্টেম্বর, মোদিবো কেতা রাষ্ট্রপতি হিসাবে কসম কবুল করেন।

মালির বর্তমানে প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিমের সঙ্গে ম্যাখোঁ
মালিতে তিনটি প্রধান ইসলামী গ্রুপ হলো আনসার আল দ্বীন, মুভমেন্ট ফর ইউনিটি অ্যান্ড জিহাদ ইন ওয়েস্ট আফ্রিকা (মুজাও) এবং আলকায়েদা ইন ইসলামিক মাগরিব (আকিম)। ফ্রান্স ২০১৩ সালের মালিতে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মালির প্রতিবেশী দেশ নাইজার থেকে একাধিক প্রেডেটর ড্রোন উড়িয়ে মালিতে বিদ্রোহীদের গতিবিধির উপর নজর রাখছে এবং ফরাসি সৈন্যদের খবরাখবর দিচ্ছে৷ বর্তমানে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী মালিতে শান্তি রক্ষার দায়িত্বে রয়েছে। এখনো দেশটিতে বিভিন্ন জঙ্গি এবং আত্মঘাতী হামলার খবর মাঝে মাঝেই শোনা যায়।
ছবিতে সান্কোরে মসজিদ ও বিশ্ববিদ্যালয়, মালির স্বকীয় স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন
২০০০
কনারি তার দাস্তরিকভাবে দুই মেয়াদে বাধ্যতামূলক সীমাবদ্ধতার ফলে ২০০২এর ইন্তেখাবে প্রতিদ্বন্দিতা করেননি এবং তৃতীয়বার রাষ্ট্রপতি হতে পারেননি। ২০০২ সালের ইন্তেখাবটি একটি মাইলফলক ছিল, ইন্তেখাবী অনিয়ম ও ভোটারদের স্বল্প ভোটদানের ধারা থাকা সত্ত্বেও মালির ইতিহাসে পহেলা বার এক গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে অন্য গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির কাছে তাকত হস্তান্তর হয়। ২০০২ এর আইনসভা ইন্তেখাবে কোনও দলই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেনি; ত্যুরে তার বাদে একটি সমস্ত রাজনৈতিক দলকে অন্তর্ভুক্ত করে সরকার নিয়োগ করেন এবং মালির সামাজিক ও অর্থনৈতিক তরক্কির মুশকিলগুলি মোকাবিলার ওয়াদা দেন।
২০১০
২০১২ সালের জানুয়ারিতে আজওয়াদের আজাদীর কওমী আন্দোলনের (এমএনএলএ) নেতৃত্বে একটি ইনকিলাব শুরু হয়েছিল। ২০১৩র ১৮ই জুন, সরকার এবং বিদ্রোহীদের মধ্যে একটি সালামত চুক্তি দস্তখত করা হয়েছিল। ২৮ শে জুলাই ২০১৩ তারিখে রাষ্ট্রপতি ইন্তেখাব অনুষ্ঠিত হয়। ইব্রাহীম আবু বকর কেতা সৌতে সৌমালা সিসিকে পরাজিত করে মালির নয়া রাষ্ট্রপতি হন । যদিও বিদ্রোহী ও মালিয়ান সরকারের মধ্যে সালামত চুক্তিটি ২০১৩ সালের নভেম্বরের শেষদিকে উত্তরের শহর কিদালে লড়াইয়ের কারণে ভেঙে গেছে।
মালিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম দল আসে ২০১৪ সালের ১ এপ্রিল। ২৫ এপ্রিল আসে মুল দল। মালিতে ১০টি দেশের শান্তিরক্ষীরা কাজ করেছে। এগুলো হলো- বাংলাদেশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, চীন, নেদারল্যান্ড, নাইজার, আইভরিকোষ্ট, সেনেগাল, চাঁদ ও বরকিনা ফসো। মালিতে বাংলাদেশী শান্তিরক্ষী সংখ্যা ১৭২২ জন ( মে ২০১৫)। এর মধ্যে সেনাবাহিনী ১৩১০ জন, নৌবাহিনী ১৩৩ জন, বিমান বাহিনী ১২৩ জন, পুলিশ সদস্য ১৪০ জন এবং স্টাফ অফিসার ১৬ জন।
শতকরা অন্তত ৪০ ভাগ মটর সাইকেল চালক মহিলা। নাইজার নদীর দুই তীরে গড়ে উঠেছে বামাকো নগরী। বামাকোর দুই অংশ দুইটি সেতু দ্বারা সংযুক্ত। সেতু সংলগ্ন পাঁচ তারকা হোটেল লিবিয়া হোটেল। লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট কর্নেল গাদ্দাফীর পতন ও মৃত্যুর পর এটি বন্ধ হয়ে যায়। গাদ্দাফী বেঁচে থাকতে মালির লিবিয়ার সাথে খুব সুন্দর সম্পর্ক ছিল। অনেক ব্রীজ, রাস্তা ঘাট লিবিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট করে দিয়েছিলেন। ইন্ডিয়ান নায়িকা ঐশ্বেরিয়া মালিতে এসে বেশ কিছু দিন থেকে গিয়েছিলেন। 
আফ্রিকার মাটির নিচে রয়েছে অসংখ্য খনিজ সম্পদ, রয়েছে শক্তিশালী জনবল। তারপরও পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্র দেশের তালিকার প্রথম ১০টি দেশই আফ্রিকার। আফ্রিকাতে মোট ৫৪টি দেশ রয়েছে।
মালির রাজধানী বামাকো।
ভূগোল
মালি হিসাবে পরিচিত অঞ্চলটি সাহারা মরুভূমির দক্ষিণ প্রান্তসীমায় অবস্থিত। তাই মালিতে দু’টি ভিন্ন ধরনের অঞ্চল রয়েছে। উত্তরাঞ্চলে রয়েছে শুষ্ক ও অনুর্বর মরুভূমি, আর এর থেকে দক্ষিণ দিকে তা ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়েছে ঘনবর্ষণ বনাঞ্চলে। এই অঞ্চলটি ‘সাহেল’ নামে পরিচিত।
মালিতে উর্বর জমির অভাব থাকলেও অন্যান্য অতি মূল্যবান সম্পদ সে অভাব পূরণ করে দিয়েছে। স্বর্ণ ও লবণের খনি শত শত বছর ধরে মালির অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করছে। মালির উত্তরাঞ্চল থেকে বাণিজ্যপথ বর্ধিত হয়ে উত্তর আফ্রিকার উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, যেখানকার ধনী ব্যবসায়ীগণ ইউরোপ ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ায় পাঠানোর জন্য চড়ামূল্যে স্বর্ণ ও লবণ কিনতে আগ্রহী ছিল। এই বাণিজ্যপথগুলো মাদিন্কা নামক পশ্চিম আফ্রিকার স্থানীয় গোত্রটিকে অবিশ্বাস্যরকম সম্পদশালী গোত্রে পরিণত করেছিল।
| Sankoré Masjid, 2007 |
অতীতের মালি ও ইসলাম
এই বাণিজ্যপথগুলো দিয়ে শুধুমাত্র মালামালই কেনাবেচা হতোনা। আইডিয়া বা চিন্তার ধারাও প্রবাহিত হতো উত্তর থেকে দক্ষিণে। স্বর্ণ আর লবণের সাথে সাথে মুসলিম বণিকগণ ইসলামকেও সাথে করে নিয়ে যেতেন। ফলে ৮ম শতক থেকে ইসলাম ধীরে ধীরে পশ্চিম আফ্রিকার সাহেলে শিকড় গাড়তে শুরু করে। প্রথমদিকে পশ্চিম আফ্রিকার অমুসলিমরা ইসলামকে দমিয়ে রাখতে চেষ্টা করে, কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে অন্ততপক্ষে সাধারণ জনগণ থেকে মুসলিমদের আলাদা রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু যখন মানুষ দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে তখন ধীরে ধীরে ইসলামী রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়ে যায়।

আফ্রিকার মানচিত্রে তৎকালীন বাণিজ্যপথগুলো দেখা যাচ্ছে যেগুলো দিয়ে এই অঞ্চলে ইসলামের আগমন ঘটে
‘মালি’ নামক এক মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন সুনদিয়াতা কেইতা নামক এক ব্যক্তি, যিনি ইতিহাসে বেশ অজ্ঞাত, তার ব্যাপারে পরিষ্কারভাবে কিছু জানা যায়না। তার জীবনের অনেক গল্প শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লোকমুখে প্রচলিত হয়ে আসছে। যার ফলে সময়ের সাথে প্রকৃত ঘটনা বিকৃত হয়ে গিয়েছে (উদাহরণস্বরূপ, একটি উপাখ্যান হচ্ছে তিনি একটি পূর্ণবয়স্ক বড় গাছ সমূলে উপড়ে ফেলেছিলেন এবং সেটা আবার তার মায়ের উঠানে রোপণ করেছিলেন)। তবে আমরা যা জানি তা হলো, তিনি মালি সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করেন এবং ১২৩০-এর দশকে পশ্চিম আফ্রিকার মুসলিম জনগণের জন্য একটি শক্ত অবস্থান সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি “মান্সা” উপাধি ধারণ করেন, মাদিন্কা ভাষায় যার অর্থ হলো রাজা।
মান্সা মুসা এবং তাঁর হজ্জ
মালির দশম “মান্সা” বা রাজা ছিল “প্রথম মুসা” যিনি ১৩১২ সাল থেকে ১৩৭৭ সাল পর্যন্ত মালি শাসন করেন। তাঁর ভাই মান্সা আবু বকর আটলান্টিক মহাসাগরে আমেরিকা আবিষ্কারের অভিযানে বের হলে মুসাকে রাজ্য পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে যান। তাঁর শাসনামল সম্পর্কে আমরা যা জানি তার বেশীরভাগই এসেছে ১৩২৪ সালে তাঁর হজ্জ পালনের ঘটনা থেকে।

ছবিতে ইউরোপীয় অ্যাটলাসে মান্সা মুসা’র রূপায়ণ
একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম হিসেবে মান্সা মুসা ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ হজ্জ পালনের সিদ্ধান্ত নেন। ভৌগলিকভাবে দুর্গম অঞ্চলে অবস্থিত বলে মালি থেকে মক্কায় যাত্রা এখনকার আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থাতেই কঠিন, আর তখনতো ছিল সেটা প্রায় অসম্ভব একটি ব্যাপার। তারপরও ১৩২৪ খ্রিস্টাব্দে মুসা ৬০,০০০ লোকের এক বিশাল কাফেলা নিয়ে মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।
যেহেতু তাঁর সাম্রাজ্য ছিল পৃথিবীর অন্যতম ধনী সাম্রাজ্যের একটি, স্বাভাবিকভাবেই সেই কাফেলা যাত্রাপথে সকলের মনে ছাপ রেখে যায়। কাফেলায় ছিল ১২,০০০ চাকর-বাকর, প্রত্যেকের পরনে ছিল মূল্যবান সিল্কের পোশাক ও সাথে ছিল ৪ পাউন্ডের এক স্বর্ণখন্ড। ৮০টি উটের প্রত্যেকটি ৫০ থেকে ৩০০ পাউন্ডের স্বর্ণগুড়া বহন করছিল যেগুলো যাত্রাপথে গরীবদের মাঝে বিলানো হয়েছিল। অভুতপূর্ব জীবজন্তু এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের আনাগোনা এই কাফেলার যাত্রাটিকে মহাকাব্যিক করে তোলে এবং যে ব্যক্তিই কাফেলাটি অবলোকন করেছে তাদের মনে তা স্থায়ী ছাপ ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। এই জাঁকজমক কাফেলার বিভিন্ন বর্ণনা বিভিন্ন এলাকার লোকজনের মুখে মুখে চালু হয়ে যায়।
মক্কার যাত্রাপথে মান্সা মুসা মিশরে যাত্রাবিরতি নেন। প্রথমে তিনি মিশরের মামলুক সুলতানের সাথে দেখা করতে অস্বীকৃতি জানান কারণ তখনকার রীতি অনুযায়ী সুলতানকে মাথা নিচু করে কুর্নিশ করতে হতো। মুসা দৃঢ়কন্ঠে জানান দেন যে তিনি শুধুমাত্র এক আল্লাহ্র সামনেই মাথা নোয়ান। মামলুক সরকার তাঁর আচরণে বেশ প্রভাবিত হয়, কারণ কর্মকর্তারা লক্ষ্য করেন যে তিনি কুরআন জানেন এবং সময়মতো নামাজ পড়াকে বেশ গুরত্ব দেন। মুসা স্পষ্টতই একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম ছিলেন।
মুসার এই অঢেল পরিমাণ সম্পদ মিশরে কিছু অনিচ্ছাকৃত ফলাফল বয়ে নিয়ে। তিনি সরকারী কর্মকর্তা, গরীব জনগণ, স্কলারসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষের মাঝে স্বর্ণ বিতরণ করেন। কিন্তু চাহিদা ও যোগানের নিয়মানুযায়ী স্বর্ণের দাম সেখানে একদম পড়ে যায়, যা মিশরের অর্থনীতিকে একদম বিকলাঙ্গ করে দেয়। এমনকি এই ঘটনার এক দশক পরেও, ইবনে বতুতার মিশর সফরের সময়ও তিনি লক্ষ্য করেন মিশরের অর্থনীতি মুসার সফরের প্রভাব বা সেই মন্দাভাব কাটিয়ে উঠতে পারেনি। মুসার মিশর সফর মালি সাম্রাজ্যের ধনসম্পদ ও এর গুরত্বের এক নিদর্শন বহন করে, এটি দেখিয়ে দেয় মালি সাম্রাজ্যের গুরুত্ব কতখানি, এমনকি দূরদূরান্তের রাজ্যসমূহতেও।
মালিতে প্রত্যাবর্তন
হজ্জের পর জন্মভূমি মালিতে ফিরে আসার সময় মান্সা মুসা সবচেয়ে বুদ্ধিমান ও প্রতিভাবান মুসলিমদেরকে নিয়ে আসার ব্যাপারে গুরত্ব আরোপ করেন। তাঁর প্রচুর ধনসম্পদ থেকে তিনি স্কলার, শিল্পী, শিক্ষক, স্থপতি এবং অন্যান্য পেশার লোকদের অর্থপ্রদান করেন যেন তারা মালিতে এসে এখানকার ইসলাম প্রচার ও প্রসারে অবদান রাখেন। মিশর, সিরিয়া, ইরাক, আল-আন্দালুস (মুসলিম স্পেন) এবং হেজাজ থেকে তিনি প্রতিভাবান ব্যক্তিদের মালিতে নিয়ে আসেন।

ছবিতে সান্কোরে মসজিদ ও বিশ্ববিদ্যালয়, মালির স্বকীয় স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন
মালির উপর এর প্রভাব ছিল অপরিমেয়। মালির স্থাপনাগুলোর মধ্যে স্পেনীয়, আরব ও পারস্যের স্থাপত্যকলার প্রভাব পড়তে শুরু করে। বিভিন্ন সংস্কৃতির এক স্বকীয় মিশ্রণের ফলে সৃষ্ট এই স্থাপত্যকলা আজও পশ্চিম আফ্রিকায় দেখা যায়। মান্সা মুসার হজ্জ প্রখ্যাত শহর তিম্বুক্তুর জন্য রহমতস্বরূপ ছিল, কেননা সেখানে সান্কোরে মসজিদের মতো অনেক মসজিদ গড়ে উঠে বিশ্বের নামকরা সব স্থপতিদের নকশায়। মান্সা মুসা আন্দালুসিয়ার স্থপতি ইবন ইসহাককে ২০০ কিলোগ্রাম স্বর্ণ প্রদান করেন তিম্বুক্তুর সান্কোরে মসজিদ নির্মাণ করার জন্য। বিশ্বসেরা স্থপতি, স্কলার এবং শিক্ষকদের ভালো মাইনে দেয়ার সুবাদে মালি এবং তিম্বুক্তু ইসলামী জ্ঞানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
জ্ঞানের কেন্দ্রবিন্দু
মুসার হজ্জের পর মালির যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনটি ঘটে তা হলো জ্ঞানের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে এর উত্থান। বিশ্বের নামকরা স্কলারদের নিয়ে মালিতে সেসময়কার সবচেয়ে সমৃদ্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয় এবং বিকশিত হয় জ্ঞানার্জনের সংস্কৃতি। গাও ও তিম্বুক্তু শহরগুলোতে ছিল প্রচুর লাইব্রেরী। ব্যক্তিগত ও সরকারী সংগ্রহে ইসলামী আইন, জ্যোর্তিবিজ্ঞান, ভাষা, ইতিহাস থেকে শুরু করে নানা বিষয়ে ছিল হাজার হাজার বই। ভালো ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো তখন আফ্রিকার সকল প্রান্ত থেকে মেধাবী শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করত।

তিম্বুক্তুর লাইব্রেরীতে তৎকালীন মালির জ্যোতির্বিদ্যা ও গণিতের পাণ্ডুলিপি
জ্ঞান আহরণের এই রীতি আজও মালিতে প্রচলিত। বিভিন্ন পরিবারের ব্যক্তিগত সংগ্রহের লাইব্রেরীতে এখনও শত শত বই দেখা যায়, যার বড় অংশ শত বছরের পুরনো। মান্সা মুসার আমল থেকে প্রাপ্ত ঐতিহ্যবাহী সেসব জ্ঞানের ব্যাপারে তারা খুবই সংরক্ষণশীল, যার ফলে বর্হিবিশ্বের জন্য এই লাইব্রেরীগুলোর নাগাল পাওয়া খুব কঠিন।
সাহেল অঞ্চলের মরুকরণের ফলে পাণ্ডুলিপিগুলো আজ হুমকির সম্মুখীন, পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে এই ঐতিহাসিক ও মহামূল্যবান বইগুলো প্রায় নষ্ট হয়ে ধুলোয় পরিণত হচ্ছে। পশ্চিম আফ্রিকায় রাজনৈতিক কোন্দলও বাকি পান্ডুলিপির ধ্বংসের কারণ হয়ে পড়েছে। এইসব মহামূল্যবান বইগুলোকে ডিজিট্যালি সংরক্ষণ করার প্রক্রিয়া হাতে নেয়া হয়েছে। তিম্বুক্তু শিক্ষা ফাউন্ডেশন এই বইগুলো ইতিহাসের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাওয়ার আগেই প্রতিটি পৃষ্ঠা স্ক্যান করার উদ্যোগ নিয়েছে। অনলাইনে আজ সবাই প্রতিটি পাণ্ডুলিপিই খুঁজে পেতে পারেন ও পড়তে পারেন।
মালি পশ্চিম আফ্রিকার জ্ঞানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়ার সাথে সাথে ইসলাম এই অঞ্চলের জনগণের হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করতে থাকে। সাধারণ মানুষের জন্যও ধর্মীয় ও সেক্যুলার বিষয়ে শিক্ষিত হওয়ার ব্যাপারটি সাধারণ একটা ব্যাপার হয়ে গিয়েছিল তখন সেখানে। সমাজে শিক্ষার প্রভাব ১৩৫০-এর দশকে ইবনে বতুতার মালি সফরের বর্ণনায় পাওয়া যায়। যেখানে তিনি মন্তব্য করেনঃ“যদি দিনটি হয় শুক্রবার, তবে কেউই তাড়াতাড়ি মসজিদে না গেলে অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে জায়গা পায়না। তাই প্রত্যেক ব্যক্তি তার বালক সন্তানকে আগেই জায়নামাজসহ মসজিদে পাঠিয়ে দেয়া একটা রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছেলেরা মসজিদে গিয়ে তাদের বাবাদের পছন্দমতো স্থানে জায়নামাজ বিছিয়ে জায়গাটি বাবারা আসা পর্যন্ত দখল করে রাখে।”
রোড টু মাল্টি পার্টি গণতন্ত্র:
1981 এবং 198২ এর সময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল ছিল এবং 1980 এর দশকে এটি সাধারণত শান্ত ছিল। মালির অর্থনৈতিক সমস্যাগুলির প্রতি তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে, সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাথে একটি নতুন চুক্তি করে। তবে, 1 99 0 সাল নাগাদ, আইএমএফের অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি এবং রাষ্ট্রপতি এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা নিজেদের দাবিগুলি পালন না করার ধারণার দ্বারা নিয়োজিত তীব্রতার দাবিগুলির সাথে অসন্তোষ বৃদ্ধি পেয়েছিল।
মাল্টিপার্টি গণতন্ত্রের দাবিতে বৃদ্ধি পেয়ে ট্রোরে সরকার কিছু সিস্টেম খোলা (স্বাধীন প্রেস এবং স্বাধীন রাজনৈতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার অনুমতি দেয়) কিন্তু জোর দিয়েছিল যে মালি গণতন্ত্রের জন্য প্রস্তুত ছিল না।
1991-এর দশকের প্রথম দিকে ছাত্রলীগের নেতৃত্বাধীন সরকার-বিরোধী দাঙ্গা আবার ভেঙ্গে পড়ে, কিন্তু এই সময় সরকারি কর্মচারীরা এবং অন্যান্যরা এটি সমর্থন করে। ২6 শে মার্চ 1991 এ 4 দিনের সরকারি বিরোধী দাঙ্গা চলাকালে 17 সেনা কর্মকর্তার একটি গ্রুপ রাষ্ট্রপতি মুসা ট্রোরেকে গ্রেফতার করে সংবিধান স্থগিত করে। আমাদৌ তৌমানী ট্যুরে জনগণের মুক্তির জন্য ট্রানজিটাল কমিটির চেয়ারম্যান হিসাবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। 12 জানুয়ারী 1 99২ তারিখে একটি গণভোটে একটি খসড়া সংবিধান অনুমোদন করা হয়েছিল এবং রাজনৈতিক দলগুলি গঠনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ২8 জুন, 199২ সালে আলফা ওমর কোনারের প্রার্থী ড অ্যালায়েন্স লা ডেমোক্রাতি এন মালি ঢালাও (এডিএমএ, মালিতে গণতন্ত্রের জন্য জোট), মালির তৃতীয় প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে উদ্বোধন করা হয়।
1997 সালে, গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে পুনর্নবীকরণের প্রচেষ্টাগুলি প্রশাসনিক সমস্যাগুলির মধ্যে দৌড়ে গিয়েছিল, যার ফলে এপ্রিল 1997 সালে অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনের আদালতের আদেশ বাতিল করা হয়েছিল। তবে এটি প্রমাণিত হয়েছিল যে, রাষ্ট্রপতি কোনারের অ্যাডমিয়া পার্টির জোরালো শক্তি, এর ফলে অন্য কিছু ঐতিহাসিক পরের নির্বাচনের বর্জন দলগুলোর। রাষ্ট্রপতি কোনারে 11 মে তারিখে স্বল্প বিরোধী দলের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জিতেছেন ড।
সাধারণ নির্বাচনের জুন এবং জুলাই 2002 সালে সংগঠিত হয়।সংবিধানের প্রয়োজনীয়তা অনুসারে দ্বিতীয় এবং শেষ মেয়াদে তিনি পদত্যাগ করছেন বলে রাষ্ট্রপতি কোন্রে পুনর্বিবেচনার চেষ্টা করেননি। মালির পরিবর্তনের সময় রাষ্ট্রের সাবেক প্রধান অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল আমাদৌ তোউমানী ট্যুরে (1991-199২) দেশটির দ্বিতীয় গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে 2002 সালে স্বাধীন প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন এবং ২007 সালে দ্বিতীয় 5 বছরের মেয়াদে নির্বাচিত হন।
উপসংহার
মালির গুরত্ব এবং বিশ্বে এর অবদান বলে শেষ করা যাবেনা। এর ইতিহাসে এটি ছিল ইসলামী জ্ঞান ও সম্পদের কেন্দ্রবিন্দু। ১৯শ শতকে ফ্রান্স উপনিবেশ গড়ার আগ পর্যন্ত ১৬শ থেকে ১৮শ শতকে এর গুরত্ব কমতে থাকে। কিন্তু এর ইতিহাস চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায়নি। পশ্চিম আফ্রিকার মুসলিমদের জীবনে এই ইতিহাস এখনো জিইয়ে আছে এবং বিশ্বে মালি যে ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছে গিয়েছে তা আজও অব্যাহত।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন