উজবেকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে উজবেকিস্তান প্রজাতন্ত্র মধ্য এশিয়ার একটি স্থলবেষ্টিত দেশ। এর রাজধানী তাশখন্দ।[১১] সার্বভৌম রাষ্ট্র একটি ধর্মনিরপেক্ষ, ঐক্যবদ্ধ সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্র, ১২ টি প্রদেশ, একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রজাতন্ত্র এবং একটি রাজধানী শহর গঠিত। উজবেকিস্তান সীমান্তে পাঁচটি স্থলবেষ্টিত দেশ রয়েছে: উত্তরে কাজাখস্তান; উত্তরপূর্ব কিরগিজস্তান; দক্ষিণপূর্ব তাজিকিস্তান, দক্ষিণ আফগানিস্তান; এবং দক্ষিণ পশ্চিমে তুর্কমেনিস্তান। লিচটেনস্টাইনের পাশাপাশি এটি বিশ্বের দুবার দ্বিগুণ স্থলবেষ্টিত দেশগুলির মধ্যে একটি (অর্থাৎ অন্যান্য স্থলবেষ্টিত দেশগুলির সাথে ভাগ করে নেওয়ার সীমানা)।[১২]
ইতিহাস
জারশাসিত উজবেকিস্তান[সম্পাদনা]
রুশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে বর্তমান উজবেকিস্তান বুখারা আমিরাত, খিভা খানাত এবং কোকান্দ খানাতের মধ্যে বিভক্ত ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে উজবেকিস্তান রুশ সাম্রাজ্যের অন্তর্গত হয়। এসময় প্রচুরসংখ্যক রুশ এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। ১৯১২ সালের হিসাব অনুযায়ী, জারশাসিত উজবেকিস্তানে বসবাসকারী রুশদের সংখ্যা ছিল ২,১০,৩০৬ জন।[১৩] প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে রুশ কর্তৃপক্ষ উজবেকিস্তানসহ কেন্দ্রীয় এশিয়া থেকে সৈন্য সংগ্রহ করার প্রচেষ্টা চালালে এ অঞ্চলব্যাপী বিদ্রোহ দেখা দেয়। ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের ফলে রাশিয়ায় জারতন্ত্রের পতন ঘটে এবং রাশিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এমতাবস্থায় রুশ সরকার উজবেকিস্তানের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে।
সোভিয়েত উজবেকিস্তান[সম্পাদনা]
১৯২০ সালের মধ্যে কেন্দ্রীয় এশিয়ায় রুশ কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়, এবং কিছু প্রতিরোধ সত্ত্বেও উজবেকিস্তানসহ সমগ্র মধ্য এশিয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯২৪ সালের ২৭ অক্টোবর উজবেক সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে হিটলারের নেতৃত্বাধীন জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করলে ১৪,৩৩,২৩০ জন উজবেক সৈন্য সোভিয়েত রেড আর্মির পক্ষে নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেয়। ২,৬৩,০০৫ জন উজবেক সৈন্য যুদ্ধ চলাকালে নিহত হন এবং ৩২,৬৭০ জন নিখোঁজ হন।[১৪]
স্বাধীনতা[সম্পাদনা]
১৯৯১ সালের ৩১ আগস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনকালে উজবেকিস্তান স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ১ সেপ্টেম্বরকে উজবেকিস্তানের জাতীয় স্বাধীনতা দিবস ঘোষণা করা হয়।
রাজনীতি
উজবেকিস্তানের রাজনীতি একটি রাষ্ট্রপতিশাসিত প্রজাতন্ত্র কাঠামোয় সংঘটিত হয়। রাষ্ট্রপতি হলেন একাধারে রাষ্ট্রের প্রধান ও সরকারপ্রধান। রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা সরকারের উপর ন্যস্ত। আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সরকার এবং দ্বিকাক্ষিক আইনসভা উভয়ের উপর ন্যস্ত। উজবেকিস্তানে সরকারী পদপ্রাপ্তি রাজনৈতিক দলের সদস্যপদ নয়, বরং কে কোন গোত্রের, তার উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।
প্রশাসনিক অঞ্চলসমূহ[সম্পাদনা]
| Division | Capital City | Area (km2) | Population (2008)[১৫] | Key |
|---|---|---|---|---|
| Andijan Region Uzbek: Андижон вилояти/Andijon Viloyati | Andijan Andijon | 4,303 | 2,965,500 | 2 |
| Bukhara Region Uzbek: Бухоро вилояти/Buxoro Viloyati | Bukhara Buxoro | 41,937 | 1,843,500 | 3 |
| Fergana Region Uzbek: Фарғона вилояти/Fargʻona Viloyati | Fergana Fargʻona | 7,005 | 3,564,800 | 4 |
| Jizzakh Region Uzbek: Жиззах вилояти/Jizzax Viloyati | Jizzakh Jizzax | 21,179 | 1,301,000 | 5 |
| Karakalpakstan Republic Karakalpak: Қарақалпақстан Республикасы/Qaraqalpaqstan Respublikasiʻ Uzbek: Қорақалпоғистон Республикаси/Qoraqalpogʻiston Respublikasi | Nukus No‘kis Nukus | 161,358 | 1,817,500 | 14 |
| কাশকদারিও অঞ্চল Uzbek: Қашқадарё вилояти/Qashqadaryo Viloyati | কার্শি Qarshi | 28,568 | 3,088,800 | 8 |
| Khorezm Region Uzbek: Хоразм вилояти/Xorazm Viloyati | Urgench Urganch | 6,464 | 1,776,700 | 13 |
| Namangan Region Uzbek: Наманган вилояти/Namangan Viloyati | Namangan Namangan | 7,181 | 2,652,400 | 6 |
| Navoiy Region Uzbek: Навоий вилояти/Navoiy Viloyati | Navoiy Navoiy | 109,375 | 942,800 | 7 |
| Samarkand Region Uzbek: Самарқанд вилояти/Samarqand Viloyati | সমরকন্দ Samarqand | 16,773 | 3,651,700 | 9 |
| Surkhandarya Region Uzbek: Сурхондарё вилояти/Surxondaryo Viloyati | Termez Termiz | 20,099 | 2,462,300 | 11 |
| Syrdarya Region Uzbek: Сирдарё вилояти/Sirdaryo Viloyati | Gulistan Guliston | 4,276 | 803,100 | 10 |
| Tashkent City Uzbek:Тошкент/Toshkent Shahri | তাশখন্দ Toshkent | 327 | 2,424,100 | 1 |
| Tashkent Region Uzbek: Тошкент вилояти/Toshkent Viloyati | Nurafshon Nurafshon | 15,258 | 2,829,300 | 12 |
The provinces are further divided into districts (tuman).
ভূগোল
সংস্কৃতি[সম্পাদনা]
উজবেকিস্তান প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সভ্যতাকে সংযুক্তকারী বিখ্যাত রেশম পথের উপর অবস্থিত। উজবেকিস্তানের জাদুঘরগুলোতে প্রায় ২০ লক্ষের মত প্রত্নবস্তু রয়েছে, যেগুলি মধ্য এশিয়ায় প্রায় ৭০০০ বছর ধরে বসবাসকারী বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। অনেক পর্যটক এই সমৃদ্ধ ইতিহাস সম্বন্ধে জানার উদ্দেশ্যে উজবেকিস্তান ভ্রমণ করেন। এছাড়াও যারা সক্রিয় পর্যটনে আগ্রহী, তাদের জন্য উজবেকিস্তানের পাহাড়গুলি চড়া এবং তুষারাবৃত পাহাড়গুলিতে স্কি করার সুব্যবস্থা আছে। উজবেকিস্তানের ২য় বৃহত্তম শহর সমরকন্দ রেশম পথের মধ্যস্থলে অবস্থিত এবং এটি বিশ্বের প্রাচীনতম শহরগুলোর একটি। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৭ম শতকে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানকার অধিবাসীরা মূলত তাজিক। ৩২৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মহান আলেকজান্ডার এটি বিজয় করেন। সমরকন্দের প্রধান আকর্ষণ রেগিস্তান নামের এলাকা, যার চারপাশ ঘিরে আছে অনেকগুলি প্রাচীন মাদ্রাসা। এছাড়াও এখানে অনেক বিখ্যাত মসজিদ ও স্মৃতিস্তম্ভ আছে।
রন্ধন[সম্পাদনা]
উজবেকিস্তানের সিগনেচার ডিশ হল পোলাও (প্লভ বা ওশ), যা সাধারণত চাল, মাংসের টুকরো এবং ভাজা গাজর এবং পেঁয়াজ দিয়ে তৈরি করা হয়।
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য জাতীয় খাবারের মধ্যে রয়েছে শর্বা (শুর্ব বা শর্বা), চর্বিযুক্ত মাংসের বড় টুকরো (সাধারণত মাটন) এবং তাজা শাকসবজি দিয়ে তৈরি একটি স্যুপ; প্রধান কোর্স; ডিম্লামা, একটি মাংস এবং সবজি স্ট্যু; এবং বিভিন্ন কাবাব, সাধারণত একটি প্রধান কোর্স হিসাবে পরিবেশন করা হয়।
মন্তি , একধরণের মোমো জাতীয় খাবার সেটিও খুব জনপ্রিয়।
জনসংখ্যা[সম্পাদনা]
উজবেকিস্তানের প্রধান ভাষা হল উজবেক ভাষা (উত্তর উপভাষাটি)। এতে উজবেকিস্তানের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ লোক কথা বলেন। প্রায় ১৪% লোক রুশ ভাষায় এবং প্রায় ৪% লোক তাজিকি ভাষায় কথা বলেন। এছাড়া পার্শ্ববর্তী দেশগুলিতে থেকে আগত অনেকগুলি ভাষা, যেমন তুর্কমেন, কাজাক ওকিরঘিজ ভাষা এখানে প্রচলিত।
উজবেক ভাষা বিংশ শতাব্দীর শুরুতে আরবি লিপিতে লেখা হত। সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ হবার পর লেনিনের অধীনে এটি লাতিন লিপিতে লেখা শুরু হয়। কিন্তু স্তালিন ক্ষমতা দখলের পর ১৯৪০-এর দশক থেকে এটি সিরিলীয় লিপিতে লেখা হতে থাকে। ১৯৯১ সালে উজবেকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করলে প্রাক্তন সোভিয়েত দেশগুলির থেকে রাষ্ট্রীয় স্বাতন্ত্র্য্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে উজবেক সরকার ১৯৯৩ সালে উজবেক ভাষা সরকারিভাবে আবার লাতিন লিপিতে লেখার আদেশ জারি করে। উজবেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে ধাপে ধাপে এই লিপি সংস্কার বাস্তবায়ন করা হয় এবং ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি এই সংস্কার সম্পূর্ণ হবে বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু এই লিপি সংস্কার সিরিলীয় লিপিতে অভ্যস্ত বয়স্ক ও প্রবাসী উজবেকদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। তাছাড়া এতে দেশটির নবীন প্রজন্মের সিরিলীয় লিপিতে লেখা ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার সম্ভাবনা আছে।
উজবেক ভাষা
উজবেক ভাষা আলতায়ীয় ভাষাপরিবারের তুর্কীয় শাখার একটি ভাষা। ভাষাটি চাগাতাই তুর্কীয় ভাষা থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে। চাগাতাই তুর্কীয় একটি বিলুপ্ত ভাষা, যেটি অতীতে এককালে সমগ্র মধ্য এশিয়ার আন্তর্জাতিক ভাষা ছিল। চাগাতাই শব্দটি চাগাতাই খানাত বা রাজ্য থেকে এসেছে। মঙ্গোল সেনাপতি চেঙ্গিজ খানের দ্বিতীয় সন্তান চাগাতাই খান রাজ্যটি শাসন করতেন।
চাগাতাই তুর্কীয় ভাষা আরবি লিপিতে লেখা হত এবং এতে আরবি ও ফার্সি ভাষার প্রভাব পড়েছিল। ১৪শ শতকে সমরকন্দের অধিবাসী তৈমুর লঙ চাগাতাই রাজ্য দখল করেন। তৈমুরের উত্তরসূরীদের পরবর্তীকালে উজবেকরা উচ্ছেদ করে। উজবেকদের একাংশ কাজাখ নামে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ১৯১৭ সালে কাজাখ ও উজবেক উভয় দলই সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশে পরিণত হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর উজবেকিস্তান ও কাজাখস্তান পৃথক রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
উজবেক ভাষাকে উত্তর ও দক্ষিণ এই দুইটি প্রধান উপভাষা দলে ভাগ করা যায়। ১৯৮৯ সালে উত্তর উজবেক ভাষাটি উজবেকিস্তান রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষায় পরিণত হয়। সেখানে প্রায় ১ কোটি ৬৫ লক্ষ লোক এই ভাষায় কথা বলেন। বর্তমানে ভাষাটি গণমাধ্যম, শিক্ষা, বিনোদন, ব্যবসা ও প্রশাসনে ব্যবহার করা হচ্ছে। উজবেকিস্তানের অর্ধেকেরও বেশি সংবাদপত্র উজবেক ভাষায় প্রকাশিত হয়। প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক-পরবর্তী স্তরের জন্য উজবেক ভাষা শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত। উজবেকিস্তান ছাড়াও এটি মধ্য এশিয়ার অন্যান্য দেশে এবং উত্তর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ও ইউরোপের কিছু প্রবাসী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ে প্রচলিত।
দক্ষিণী উজবেক ভাষায় আফগানিস্তানের প্রায় ১৫ লক্ষ লোক কথা বলেন। এদের সাক্ষরতার হার কম। দক্ষিণী উজবেক ভাষা পাকিস্তান ও তুরস্কেও প্রচলিত।
অর্থনীতি[সম্পাদনা]
উজবেকিস্তান ইউরেনিয়াম উৎপাদনে বৈষয়িকভাবে সপ্তম।[১৬][১৭][১৮]
খেলাধূলা[সম্পাদনা]
বক্সিং এখানকার জনপ্রিয় খেলা। অলিম্পিকে সাম্প্রতিককালে বক্সিং-এ ৫ টি স্বর্ণপদক সমেত মোট ১৫টি পদক পেয়েছে যা দেশটির সর্বোচ্চ। মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ ও বাখোদির জালোলভ দেশের খ্যাতনামা বক্সার।
২০১১ এএফসি এশিয়ান কাপ দেশটির ফুটবল ইতিহাসের গৌরব ক্ষণ। সেই টুর্নামেন্টে জাতীয় দল চতুর্থ স্থান অর্জন করে। রাভশান ইরমাটোভ একজন বিখ্যাত উজবেক ফুটবল ম্যাচ রেফারি ছিলেন যিনি সর্বাধিক সংখ্যক বিশ্বকাপ ম্যাচ পরিচালনা করেছেন।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন