তাজিকিস্তান দক্ষিণ-পূর্ব মধ্য এশিয়ার একটি স্থলবেষ্টিত প্রজাতন্ত্র। এর উত্তরে কিরগিজস্তান, উত্তরে ও পশ্চিমে উজবেকিস্তান, পূর্বে গণচীন এবং দক্ষিণে আফগানিস্তান। দুশান্বে দেশের বৃহত্তম শহর ও রাজধানী। গোর্নো-বাদাখশান স্বায়ত্তশাসিত এলাকাটি তাজিকিস্তানে অবস্থিত; এটি একটি জাতিগত অঞ্চল যা দেশটির ৪৫% এলাকা জুড়ে অবস্থিত।
দেশের অধিকাংশ জনগণ তাজিক জাতির লোক। এরা তাজিক নামের একটি ফার্সি জাতীয় ভাষায় কথা বলে। ১৯২৯ সালে তাজিকিস্তান সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি অংশে পরিণত হয়। ১৯৯১ সালে এটি স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতার ঠিক পর পরই দেশটিতে সাম্যবাদী সরকার ও বিরোধী দলগুলির মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। ১৯৯৭ সালের জুন মাসে দুই পক্ষ একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করে। যুদ্ধ অবসানের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বৈদেশিক সাহায্য দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখতে শুরু করে। তবে অন্যান্য মধ্য এশীয় দেশগুলোর মতনই বিভিন্ন এনজিও দেশটিতে স্বেচ্ছাচারী শাসন ব্যবস্থা (প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রাহমন ১৯৯৪ সাল হতে দেশটির একচ্ছত্র অধিপতি হিসেবে শাসন করে আসছেন), ধর্মীয় স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা, দুর্নীতি এবং ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিন্দা জানিয়ে আসছে।
তাজিকিস্তান জাতিসংঘ, সিআইএস, ওএসসিই, ওআইসি, ইসিও, এসসিও এবং সিএসটিও এর সদস্য।
তাজিকিস্তানের শাব্দিক অর্থ তাজিকদের আবাসস্থল। যেখানে ফার্সি স্থান অনুসর্গ ব্যবহৃত যার অর্থ জায়গা[৫] বা "দেশ"[৬] ।বিংশ শতাব্দীর শেষ কয়েকটি দশকে সোভিয়েত প্রশাসনের অধীনে চলে যাওয়ার পরই এ নামটি তাজিকদের জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। এর আগে কখনো ইরানের কোনো অংশের জন্য অথবা ইরানি ভাষাভাষী লোকদের জন্য এ শব্দটি ব্যবহৃত হতো। সোভিয়েত প্রশাসনই মধ্য এশিয়ার তাজিক জনগণের জন্য এ শব্দটি নির্বাচন করে।
তাজিকিস্তানের ইতিহাস
তাজিকিস্তান এর নাম শুনা যায় সামানি সাম্রাজ্য (৮৭৫-৯৯৯) থেকে। তাজিক জনগণ রাশিয়ার শাসনে আসে ১৮৬০ দশকের দিকে। বাসমাখী বিদ্রোহ সাহায্য করে ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব এর এবং যার ফলাফল ১৯২০ দশকের রুশ গৃহযুদ্ধ। ১৯২৪ সালে তাজিকিস্তান সোভিয়েত ইউনিয়নের স্বায়ত্তশাসিত সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র এর অংশ হয় উজবেকিস্তানের সাথে। ১৯২৯ সালে তাজিকিস্তান সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি মূল অংশ হয়ে দাঁড়ায় – তাজিক সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র নামে –এবং এটি ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মাধ্যমে স্বাধীনতা পূর্ব পর্যন্ত থাকে।
তখন থেকে এটি সরকার এবং তাজিক গৃহযুদ্ধের তিনটি অভিজ্ঞতা লাভ করে। ১৯৯৭ সালে প্রতিদ্বন্দ্বী দলসমূহের মধ্যে একটি শান্তিচুক্তি হয়।
প্রাচীনত্ব (৬০০ খ্রিষ্টপূর্ব – ৬৫১ খ্রিষ্টাব্দ)
ব্রোঞ্জ যুগে তাজিকিস্তান ব্যাক্টিরিয়-মার্জিয়ানা প্রত্নতত্ত্বীয় মিশ্রণের অংশ ছিল, প্রোটো-ইন্দো-ইরানীয় বা প্রোটো-ইরানীয় সাংস্কৃতির প্রার্থী। প্রথম শ্রেণীর প্রাচীনত্বের মধ্যে তাজিকিস্তান স্কাইথিয়া এর অংশ ছিল।
আধুনিক তাজিকিস্তানের বেশিরভাগ অংশই ছিল প্রাচীন কাম্বুজা এবং পারামা কাম্বুজা রাজ্যের অংশ, যার উল্লেখ পাওয়া যায় ভারতীয় মহাকাব্য মহাভারত এর মধ্যে। ভাষাবিজ্ঞান এর প্রমাণ সাথে প্রাচীন সাহিত্য এবং লিপি অনেক ইন্দো বিজ্ঞানী সমাপ্তি টানেন যে প্রাচীন কাম্বুজাস মূলত ছিল মধ্য এশিয়ার অংশ। আচারিয়া ইয়াস্কার নিরুক্তা[১] (৭ম খ্রিস্টপূর্ব শতকে) সাক্ষ্য দেয় যে ক্রিয়া “সাভাতি” ব্যবহার করা হয় “যাও” অর্থে মূলত শুধুমাত্র কাম্বুজাসদের দ্বারা ব্যাবহৃত হত। দেখানো হয় যে আধুনিক গালছা উপভাষা মূলত পামির ভাষায় বলা হয় এবং অক্সাস নদীর দেশগুলো এখনো প্রাচীন কাম্বুজার “সাভাতি” শব্দটি ব্যবহার করে “যাও” অর্থে।[২] ইয়াগনুবী প্রদেশে যেটি সগডিয়ানায় জেরাভসান উপত্যকায় প্রচলিত ইয়াগনুবী উপভাষাতে প্রাচীন কাম্বুজার অনশিষ্টাংশ “সু” আছে যেটি ‘সাভাতি’ থেকে যা ‘যাও’ অর্থে ব্যবহৃত।[৩] উপরন্তু, স্যার জর্জ গ্রিয়ারসন বলেন যে বাদাখশান এর উপস্থিতির বুলি ছিল অনেকটা নরম তিন শতাব্দী আগে ফার্সি এর স্থানচুত্যির পূর্ব পর্যন্ত।[৪] যদিও, প্রাচীন কাম্বুজার মধ্যে সম্ভবত রয়েছে বাদাখশান, পামিরস এবং উত্তরাঞ্চল যার মধ্যে ছিল অক্সাস এবং জাক্সারটাস এর ইয়াগনুবী প্রদেশ দোয়াবের মধ্যে।[৫] পূর্বদিকে ইয়ার্কান্দ এবং কাশগর দ্বারা মোটামোটিভাবে বেষ্টিত ছিল, পশ্চিমদিকে বালখ (উত্তরমদ্রা), উত্তর-পশ্চিমদিকে সোগাদিয়ানা, উত্তরদিকে উত্তরকুরু, দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে দার্দা এবং দক্ষিণ দিকে গান্ধারা দ্বারা। অসংখ্য ভারততত্ত্ববিদ মূল কাম্বুজাকে শনাক্ত করেন পামিরস এবং বাদাখশান এর মধ্যে এবং পার্মা কাম্বুজাকে দূর উত্তর, অতি-পামিরীয় সীমানা অংশীভূত করে জেরাভশান উপত্যকাকে, উঁচু উত্তর হচ্ছে সোগদিয়ানা/ফারগ্না এর অংশ – প্রাচীন লেখদের স্কাইথিয়ায়।[৬] যদিও, বুদ্ধপূর্ব সময়ে (খ্রিস্টপূর্ব ৭ম বা ৬ষ্ট শতক), সোগাদিয়ানার জেরাভিশান উপত্যকাসহ আধুনিক তাজিকিস্তান মিলে প্রাচীন কাম্বুজা এবং পারামা কাম্বুজা রাজ্য প্রতিষ্টিত হয়েছিল এবং এটি ইরানী কাম্বুজাদের দ্বারা শাসিত হত যতদিন না এটি আকিমিনীয় সাম্রাজ্য এর অংশ হয়ে উঠে।
সোগাদিয়ানা, ব্যাক্টরিয়া, মার্ভ এবং খোয়ারিজম ছিল প্রাচীন মধ্য এশিয়ার চারটি প্রধান বিভাগ যেটি অধ্যুষিত হয় বর্তমান সময়ের তাজিকিস্তানের তাজিক জাতির পূর্বপুরুষ দ্বারা। বর্তমানে তাজিকদের পাওয়া যায় শুধুমাত্র ঐতিহাসিক ব্যাক্টরিয়া এবং সোগাদিয়ানায়। মার্ভ অধ্যুষিত হয় তুর্কি দ্বারা এবং খোয়ারিজম অধ্যুষিত হয় উজবেক এবং কাজাক জাতি দ্বারা। সোগাদিয়ানা সৃষ্টি হয় জেরাভশান এবং কাশকা-দরিয়া নদী উপত্যকা দ্বারা। বর্তমানে সোগাদিয়ানার জীবিত মানুষ যারা সোগদিয় উপভাষায় কথা বলে তারা হচ্ছে ইয়াগনুবীয় এবং শুঙ্গানীয়। ব্যাক্টরিয়া শনাক্ত করা হয় আফগানিস্তানের উত্তরদিকে(বর্তমান আফগান তুর্কিস্থান) হিন্দু কোস এবং আমু দরিয়া(অক্সাস) নদীর মধ্যবর্তী পর্বতাঞ্চলে এবং বর্তমান দক্ষিণ কাজিকিস্তানের কিছু অঞ্চলে। বিভিন্ন সময়ে, ব্যাক্টরিয়া ছিল বিভিন্ন রাজ্য এবং সম্রাজ্যের কেন্দ্র এবং সম্ভবত সেখানে জরাথুস্ট্রবাদ এর উৎপত্তি হয়। জরাথুস্ট্রবাদের ধর্মীয় গ্রন্থ আভেস্থা পুরনো-ব্যাক্টরিয়ান উপভাষায় লিখা, ধারণা করা হয় যে জরথুস্ত্র খুব সম্ভবত ব্যাক্টরিয়াতে জন্মগ্রহণ করেন।
আকিমিনীয় সাম্রাজ্য(৫৫০ খ্রিষ্টপূর্ব – ৩২৯ খ্রিষ্টপূর্ব)[সম্পাদনা]
আকিমিনীয় সাম্রাজ্যের শাসনকালে, সোগাদিয়ানা এবং ব্যাক্টরিয়া ছিল ফার্সি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। সোগাদিয়ানা এবং ব্যাক্টরিয়া তখন আকিমিনীয় সাম্রাজ্যের প্রশাসন এবং সামরিকদের গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসাবে অধৃকিত করেছিল।
হেলেনিস্টিক সাম্রাজ্য(৩২৯-৯০ খ্রিষ্টপূর্ব)[সম্পাদনা]
ফার্সি সাম্রাজ্য যখন মহান আলেকজান্ডার দ্বারা পরাজিত হয়, ব্যাক্টরিয়া, সোগাদিয়ানা, এবং মার্ভ অঞ্চলসমূহ ফার্সি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় তাদের নিজেদেরকে প্রতিহত করতে হয়েছে নতুন অনুপ্রবেশকারীদের থেকে। এমনকি ম্যাসেডোনিয়ার লোকদের বেশ শক্তভাবে সহ্য করতে হয়েছে সোগাদিয়ানার শাসোক স্পিটামিনিসকে। মহান আলেকজান্ডার কোনভাবে স্থানীয় শাসকের মেয়ে রোকসানাকে বিয়ে করতে পেরিছিলেন এবং তার রাজ্যের উত্তরাধিকার লাভ করেছিলেন। আলেকজান্ডারের দখলের পর, হেলেনিস্টিক সাম্রাজ্য এর উত্তরাধিকারী রাজ্য সেলেসুয়িড এবং গ্রিক-ব্যাক্টরিয়াকে আরো ২০০ বছর শাসন করে যেটি গ্রিক-ব্যাক্টরিয়া সাম্রাজ্য নামে পরিচিত ছিল। ৯০ খ্রিষ্টপূর্ব থেকে ৩০ খ্রিষ্টপূর্ব পর্যন্ত সময়ে, হেলেনিস্টিকের শেষ উত্তরাধিকারী রাজ্য ইহুজীদের দ্বারা ধ্বংস করে এবং তুকাহারি(যাদের সাথে তাদের গাঁড় সম্পর্ক ছিল) এর সাথে তারা খুশান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে ৩০ খ্রিষ্টপূর্বের দিকে।
খুশান সাম্রাজ্য(৩০ খ্রিষ্টপূর্ব – ৪১০ খ্রিষ্টাব্দ)[সম্পাদনা]
আরো ৪০০ বছরের জন্য, ৪১০ খ্রিষ্টাব্দের পূর্ব পর্যন্ত, খুশান সাম্রাজ্য ছিল রোমান সাম্রাজ্য, পার্থিয়া সাম্রাজ্য, এবং চীনের হান সাম্রাজ্য এর সাথে সে এলাকার প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যে একটি ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ২য় শতাব্দীতে যখন হান সাম্রাজ্য এর কূটনৈতিক এই এলাকা ভ্রমণ করেন তখন স্থানীয় লোকদের সাথে উল্লেখযোগ্য যোগাযোগ করা হয়েছিল। খুশান সাম্রাজ্যের শেষে, সাম্রাজ্য অনেক ছোট হয়ে এসেছিল এবং তাদেরকে শক্তিশালী সাশানিদ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে প্রতিহত করতে হয়েছিল যারা পার্থিয়া সাম্রাজ্যকে প্রতিস্থাপিত করেছিল। জনপ্রিয় খুশান রাজা কানিশকা বৌদ্ধ ধর্মকে উন্নীত করেন এবং সে সময় বৌদ্ধ ধর্ম মধ্য এশিয়া থেকে চীনে যায়।
সাশানীয়, হেপথালীয় এবং গকতুর্ক (২২৪-৭১০)[সম্পাদনা]
সাশানীয়রা যতটুকু শাসন করেছে তার প্রায় সবকিছুই এখন তাজিকিস্তান, কিন্তু হেপথালীয়(সম্ভবত ইরানী গোত্র) এর কাছে তাদের অঞ্চল হারায় প্রথম ফিরোজের শাসনকালে।
তারা একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে যেটি ইরানকে একটি করদ-রাজ্যে পরিণত করে ৪৮৩-৪৮৫ সালের দিকে। ফার্সির শাহ ফিরোজ হেপথালীয়দের সাথে তিনটি যুদ্ধ করে। প্রথম যুদ্ধে সে হেপথালীয় সৈন্যের হাতে বন্দি হয় এবং পরবর্তিতে বাইজেন্টাইন সম্রাট তাকে মুক্তিপণ দিয়ে মুক্ত করেন। দ্বিতীয় যুদ্ধে ফিরোজ আবার বন্দি হন, এবং হেপথালীয় রাজাকে বিশাল চাঁদা দিয়ে মুক্তি লাভ করেন। তৃতীয় যুদ্ধে ফিরোজ নিহত হন। হেপথালীয়দের বশে আনা হয় ৫৬৫ সালে সাশানীয় এবং কক-তুর্কদের সম্মিলিত শক্তিতে। পরবর্তিতে কক-তুর্ক এবং সাশানীয় উভয়েই বর্তমান তাজিকিস্তান শাসন করে।সাশানীয় সাম্রাজ্যের পতনের পর তুর্কিরা তা শাসন করে কিন্তু চীনের লোকদের কাছে শাসন হারায়, তাসত্ত্বেও, তারা কোনভাবে পরবর্তিতে তাজিকিস্তানের শাসন পুনদখল করে, শুধুমাত্র ৭১০ সালে আরবদের কাছে তা হারানোর জন্য।
মধ্যযুগীয় ইতিহাস(৭১০ – ১৫০৬)[সম্পাদনা]
আরবের খিলাফত(৭১০-৮৬৪)[সম্পাদনা]
ট্রান্সক্সিয়ানিয়া এর আগে কখনো এতো টেকসই মৈত্রীপূর্ণ আধিপত্য লাভ করেনি। ৬৫১ সালের শুরুর দিকে আরবরা সুগঠিতভাবে ট্রান্সক্সিয়ানিয়ার গভীরে শাসন শুরু করে, কিন্তু সেটি ৭০৫ সালে প্রথম ওয়ালিদের শাসনকালে ইবনে কুতুবিয়া খোরাসান গভর্নর হিসাবে আসার পূর্ব পর্যন্ত নয়। সে খিলাফত যুক্ত করার নীতি ধার নেয় এবং অক্সাস এর দূরবর্তি অঞ্চল দখল করে। ৭১৫ সালে যুক্ত করার পরিকল্পনা সম্পন্ন হয়। পুরো অঞ্চল খিলাফত এবং ইসলামের শাসনের মধ্যে আসে, ফলে আরবরা স্থানীয় সোগাদিয়ান রাজা এবং দিখানদের মধ্যে শাসন করতে থাকে। আব্বাসীয় খিলাফত(৭৫০-১২৫৮) শাসনে উত্তীরণের ফলে মধ্য এশিয়ায় এক নতুন যুগের সূচনা হয়। যখন তাদের পূর্বসুরীর উমাইয়াত(৬৬১-৭৫০) আরবের গোত্রগুলোর মধ্যে মৈত্রীতায় অমনোযোগী ছিল, সেখানে আব্বাসীয়রা বহুজাতিক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠা করে যেটি সাশানীয়দের জন্য অনুকরণীয় এবং নিখুঁত শাসনযন্ত্র হয়ে উঠে। তারা সুদূর পূর্ব এবং ট্রান্সক্সিয়ানাকে একত্বতা প্রদান করে যেটি মহান আলেকজান্ডারের সময় থেকে তাদের মধ্যে অনুপস্থিত ছিল।
সামানি সাম্রাজ্য (৮১৯-৯৯৯)[সম্পাদনা]
সামানি সাম্রাজ্য শাসন করে (৮১৯-১০০৫) বৃহত্তর খোরশান(পূর্ব ইরান এবং ট্রান্সক্সিয়ানাসহ) এবং এটি প্রতিষ্ঠা করেন সামান খোদা। সামানিয়রা প্রথম বিশুদ্ধ বংশদর শাসক যারা মুসলিমদের আরব বিজয়ের পর পারস্য শাসন করে। প্রথম ইসমাইল যে ইসমাইল সামানি নামেও পরিচিত ছিল সামান খোদার উত্তরসূরী, তার শাসনকাল (৮২৯-৯০৭) এ সামানিয় সাম্রাজ্য খোরশান পর্যন্ত বৃস্তিত হয়। ৯০০ সালে, ইসমাইল পরাজিত হয় খোরশানে সাফারিদদের কাছে(যেটি বর্তমান উত্তর-পশ্চিম আফগানিস্তান এবং উত্তর-পূর্ব ইরান), যখন তার ভাই ট্রান্সক্সিয়ানার গভর্নর ছিল। যদিও, সামানিয়দের শাসন প্রসংশিত হয় রাজ্যসমূহ একত্রীকরণের জন্য। বুখারার (সামানি রাজধানী) শহরসমূহ এবং সমরকন্দ হয়ে উঠে সাহিত্য, বিজ্ঞান এবং শিল্পের কেন্দ্র, শিল্প যার মধ্যে ছিল মৃৎশিল্প এবং তামা ঢালাই। ৯৫০ সালের পর সামানিদের শক্তি দূর্বল হয়ে পড়ে, কিন্তু ৯৭৬ থেকে ৯৯৭ এর দিকে তা পুনুরিজ্জীবিত হয়ে উঠে নুহ দ্বিতীয় এর শাসনকালে। কিন্তু তুর্কিত মুসলিম অভিযানের ফলে সামানিয়রা অক্সাস নদীর দক্ষিণ দিকের রাজত্ব হারায় গজনভিদের কাছে। সামানিয় ইসমাইল মুনতাসির(মৃত্যু ১০০৫) চেষ্টা করেন রাজত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার(১০০০-১০০৫), কিন্তু সে আরব বেদুইনদের হাতে নিহত হয়।[৭] কারখানিদ তুর্কিদের আক্রমণে সামানি সাম্রাজ্য ৯৯৯ সালে সমাপ্তি হয় এবং ট্রান্সক্সিয়ানার শাসন তুর্কির শাসকদের হাতে চলে যায়।
কারখানিদ(৯৯৯-১২১১) এবং খোয়ারিজম(১২১১-১২১৮)[সম্পাদনা]
সামানিয়দের পতনের ফলে মধ্য এশিয়া হয়ে উঠে অসংখ্য অনুপ্রবেশকারীদের যুদ্ধ ময়দান যারা উত্তর-পূর্ব থেকে এসেছিল।
মঙ্গল শাসন (১২১৮-১৩৭০)[সম্পাদনা]
মঙ্গোল সাম্রাজ্য পুরো মধ্য এশিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পরে, খোয়ারিজম সাম্রাজ্য আক্রমণ করে এবং বুখারা ও সমরকন্দ শহরসমূহ ধ্বংস করে, সবজায়গা জুড়ে লুঠ এবং মানুষদের হত্যা করে।
তৈমুরি সাম্রাজ্য (১৩৭০-১৫০৬)[সম্পাদনা]
তৈমুরি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন তৈমুর, যে ৮ এপ্রিল ১৩৩৬ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করে সমরকন্দের পাশে কেশ এ। সে তুর্কিউদ্ভোত বারলাশ গোত্র, যেটি মঙ্গোলের একটি উপ-পদ যা ট্রান্সক্সিয়ানার স্থায়ী হয়েছিল তার সদস্য ছিল চেঙ্গিস খানের ছেলে চাগাতি এর সাথে একটি অভিযানে অংশ নেয়ার পর। তৈমুর তার জীবন শুরু করে ডাকাত দলের সর্দার হয়ে। সে সময় তার পায় একটি তীরের আঘাত পায় এবং যার ফলে তার নাম ল্যাংড়া তৈমুর বা তৈমুর-এ লাং( দারিতে) হয়। যদিও হেরাতের শেষ তৈমুর শাসক বদি-উজ-জামান পরাজিত হয় উজবেক মোহাম্মদ সাইবানি খানের সৈন্যদের কাছে ১৫০৬ সালে, ফেরঘানা এর তৈমুর শাসক জহির উদ্দিন বাবর সে যাত্রায় বেঁচে যান এবং পুনরায় তৈমুরি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন যা ভারতে ১৫২৩ সাকে মুঘল সাম্রাজ্য নামে পরিচিত হয়।
প্রাথমিক আধুনিক সময়ের ইতিহাস(১৫০৬ – ১৮৬৮)[সম্পাদনা]
তুর্কি শাসন(১৫০৬-১৫৯৮)[সম্পাদনা]
সায়বানিদ রাজ্য বিভাজিত হয় উপরাজ্যে বংশধরদের সকল পুরুষ সদস্যের মধ্যে(সুলতান), যারা মনোনীত হয় সর্বোচ্চ নেতা(খান), গোত্রের প্রবীণতম সদস্য দ্বারা। খানের সিংহাসন ছিল প্রথমে সমরকন্দে যেটি তৈমুরদের রাজধানী, কিন্তু কিছু কিছু খানরা তাদের রাজ্যেই থাকতে বেশি সাচ্ছন্দবোধ করতেন। যদিও বুখারা প্রথম খানদের সিংহাসন হয় উবাইদ আলী খানের শাসনকালে (শাসনকালঃ ১৫৩৩ -১৫৩৯)।
রাজনৈতিক বিস্তার এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বেশিদিন ধারণ করেনি। আব্দুল্লাহ খানের মৃত্যুর পর সায়বানিদ রাজবংশের সমাপ্তি কিছুদিনের মধ্যেই হয় এবং তারা প্রতিস্থাপিত হয় জানিদ বা অস্ত্রখানিদ রাজবংশ দ্বারা, যেটি জখীদের বংশদরদের আরেকটি উপশাখা, যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জানি খান যার সাথে আব্দুল্লাহ খানেরও সম্পর্ক ছিল, আব্দুল্লাহ খানের বোনকে বিয়ের মাধ্যমে। বলা হয়ে থাকে অস্ত্রখনিদরা হাশেমীদের সাথেও যুক্ত ছিল ইমাম কলি খানের সৈয়দ উপমর্যাদার কারণে। তাদের বংশধররা আজও ভারতে বসবাস করে আসছে। ১৭০৯ সালে পূর্বদিকের বুখারার খান্তে আলাদা হয়ে কখান্দ খান্তে গঠিত হয়। যদিও কখান্দ খান্তে থেকে পূর্বদিকের অংশ বর্তমান তাজিকিস্তান, যেখানে পশ্চিমদিকের অংশ বুখরার খান্তে হিসাবে থেকে গেছে।
ফার্সি এবং বুখরীয়দের শাসন(১৭৪০-১৮৬৮)[সম্পাদনা]
১৭৪০ সালে জানিদ খান্তে দখল করেন নাদের শাহ, পারস্যের আফছারিদ রাজবংশের শাসক। জানিদ খান আবু আল-ফাইজ তার সিংহাসনেই থাকেন নাদেরের অধীনে।
১৭৪৭ সালে নাদের শাহের মৃত্যুর পর মাঙ্গিয় গোত্রের প্রধান মোহাম্মদ রহিম বিন আজালিক অন্যান্য গোত্রের প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাস্ত করে বুখারা খান্তের শাসন দৃঢ় করেন। যদিও তার উত্তরাধিকারী খানদের নামে শাসন করে। ১৭৮৫ সালে শাহ মুরাদ তার পারিবারিক বংশ(মাঙ্গিত রাজবংশ) সাজান এবং খান্তে হয়ে যায় বুখরা আমিরাত। [৮]
আধুনিক ইতিহাস(১৮৬৮ – ১৯৯১)[সম্পাদনা]
রুশ অধীনস্তা (১৮৬৮-১৯২০)[সম্পাদনা]
রুশ সাম্রাজ্যবাদ রুশ সাম্রাজ্যকে নিয়ে যায় মধ্য এশিয়া বিজয় করতে ১৯শতকে শেষের দিকে সাম্রাজ্যবাদ যুগে। ১৮৬৪ থেকে ১৮৮৫ পর্যন্ত রাশিয়া ধীরে ধীরে রুশ তুর্কেনিস্তানের পুরো অঞ্চল দখল করে, তাজিকিস্তান অংশ যেটি বুখরার আমির এবং কখান্দ(যেটি আজকের কাজাখস্তান সীমান্ত উত্তরে, কাস্পিয়ান সাগর পশ্চিমে এবং আফগানিস্তান সীমান্ত দক্ষিণে) এর খান্তে দ্বারা পরিচালিত। তাসখান্ত ১৮৬৫ সালে দখল হয় এবং ১৮৬৭ সালে তুর্কিস্তান গভর্নর-জেনারেল তৈরি করা হয় কন্সটান্টিন পেট্রোভিক ভন কফম্যান কে প্রথম গভর্নর-জেনারেল হিসাবে।[৯][১০]
১৮৬০ দশকের শুরুর দিকে আমেরিকার গৃহযুদ্ধ এবং রাশিয়ার অর্থনৈতিক আগ্রহ থেকে এই বিস্তার অনুপ্রাণিত ছিল, আমেরিকার গৃহযুদ্ধ যেটি রুশ শিল্পতে কটন সরবরাহ করতে ব্যাঘ্যাত করছিল এবং রাশিয়া বাধ্য হয়ে মধ্য এশিয়ার দিকে দৃষ্টি দেয় কটন সরবরাহের বিকল্প বাজার খুঁজতে যেটি রাশিয়ার জন্যও লাভবান হবে। রুশ শাসকরা ১৮৭০ দশকের দিকে চাষবাদের অঞ্চলসমূহকে কটন উৎপাদনে বদলানোর(একটি প্রক্রিয়া যেটি পরবর্তিতে সোভিয়েতরা অনুকরণ করে বিস্তৃত লাভ করে)। [১১] ১৮৮৫ সালের মধ্যে তাজিকিস্তান অঞ্চল হয় রুশ সাম্রাজ্য দ্বারা অথবা তার সহকারী অঞ্চল দ্বারা শাসিত হয়, বুখরার আমিরাত এমনকি তাজিকরা কিছু রুশ প্রভাব অনুভব করতে পারে।[১১]
রুশ সাম্রাজ্য অনেক বড় রাজ্য হয় বিশাল জনসংখ্যা নিয়ে এবং সাথে একটি অত্যাধুনিক সৈন্যবাহিনী নিয়ে তাদের তাজিক জনসংখ্যা দ্বারা অধ্যুষিত অঞ্চল দখল করতে কিছু কষ্ট করতে হয়, জিজাক্কা, উরা-তায়ুব অঞ্চলে বিশাল বাধার সম্মুখীন হয় এবং সমরখন্দ এ পৌছায় ১৮৬৮ সালে তখন শহরিসবজ এর সৈন্য এবং সে এলাকার বাসিন্দারা তাদের ঘিরে ফেলে। বুখারা আমিরাত এর সেনাবাহিনী তিনবার পরাজিত হয়, এবং ১৮৬৮ সালের ১৮ জুন আমির মোজাফফর উদ্দিন(শাসনকালঃ ১৮৬০-১৮৮৫) রুশ তুর্কিস্তান গভর্নর জেনারেল ভন কফম্যান এর সাথে একটি শান্তি চুক্তি করেন। সমরখন্দ এবং জেরাবশান রাশিয়ার সাথে সংযুক্ত হয় এবং রুশ ব্যাবসায়ীদের জন্য দেশগুলো খুলে দেয়া হয়। আমির তার সিংহাসনেই থাকেন রাশিয়ার অধীনস্থ হয় এবং রুশদের সাহায্যে শহরিসবজ, জেরাবশান উপত্যকা ও পর্বতাঞ্চল(১৮৭০) এবং পশ্চিম পামির(১৮৯৫) দখল করে।
১৯ শতকের শেষের দিকে জাদিদবাদী যারা নিজেদেরকে ইসলামি-সামাজিক আন্দোলন হিসাবে সমগ্র অঞ্চল জুড়ে প্রতিষ্ঠা করে। যদিও জাদিদবাদীরা আধুনিক ছিল এবং রুশ-বিরোধী ছিল না, কিন্তু রুশরা এই আন্দোলনকে একটি হুমকিরূপে দেখে।[১২] রুশ সৈন্যদের দরকার ছিল কখান্দ এর খান্তের বিদ্রোহ থামাতে ১৯১০ এবং ১৯১৩ এর মধ্যে। জুলাই ১৯১৬ সালের দিকে অন্যান্য জায়গায় বিদ্রোহ হয় যখন কুজান্দে রুশ সৈন্যদের উপর আক্রমণ হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ষড়যন্ত্রের হুমকি হিসাবে। যদিও রুশ সৈন্যরা দ্রুত কুজান্দকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে, সারা বছরজুড়ে তাজিকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহ হতে থাকে।[১১]
১৯২০ সালের আগস্টে শেষ আমির সৈয়দ আলিম খান সিংহাসনচুত্য হয় সোভিয়েত সৈন্য দ্বারা। ১৯২০ সালের ৬ অক্টোবর আমিরাতকে বুখরান সোভিয়েত গণপ্রজাতন্ত্র নামে প্রচারিত হয়।
বাসমাখী আন্দোলন (১৯১৬-১৯২৪)[সম্পাদনা]
বাসমাখী আন্দোলন বা মধ্য এশীয় বিদ্রোহ ছিল রুশ সাম্রাজ্য এবং সোভিয়েত শাসনের বিরুদ্ধে একটি অভ্যুত্থান, যেটি ১৯১৭ সালের রুশ বিদ্রোহের পর প্রখর হয়ে উঠে পুরো মধ্য এশিয়া জুড়ে। এই আন্দোলনের শিকড় মূলত ১৯১৬ সালে রুশ সাম্রাজ্য দ্বারা ব্যাধ্যতামূলকভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মুসলিম সৈন্যদল নিয়োগ করা।[১৩] ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিদ্রোহের পরবর্তি সময়ে বলশেভিকরা রুশ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশ দখল করতে থাকে ফলে রুশ গৃহযুদ্ধের শুরু হয়। তুর্কেনিস্তানের মুসলিমরা রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে একটি স্বশাসিত সরকার গঠন করে ফেরঘানা উপত্যকার শহর ককান্দে। বলশেভিকরা ১৯১৮ সালের ফেব্রুয়ারি তে একটি আক্রমণ করে এবং একটি গণহত্যা চালায় যাতে ২৫০০০ এরও বেশি লোকদের হত্যা করে।[১৪][১৫] এই গণহত্যা বাসমাখী আন্দোলন আরও দৃঢ় করে যারা গেরিলা এবং প্রচলিত যুদ্ধ চালায় যেটি ফেরঘানা উপত্যকার বিরাট অংশ দখল করে এবং যার বেশিরভাগই তুর্কিস্থানের।
১৯২০ দশকের প্রথম দিকে এই অপরিকল্পিত আন্দোলন উঠানামা করে কিন্তু ১৯২৩ সালের দিকে রেড় আর্মি বা লাল সৈন্যবাহিনীর কাছে অসংখ্য পরাজয় লাভ করে। লাল সেনাদের কিছু বিশাল অভিযান এবং অর্থনৈতিক ও ইসলামী সম্পর্কে অনুমোদন দিলে ১৯২০ দশকের মধ্যবর্তী সময়ে বাসমাখীরা জনপ্রিয়তা হারায়।[১৬] সোভিয়েত/রুশ শাসন বিরুধীতায় পুনরায় আগুন জ্বলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে যৌথীকরণ অভিযানের ফলে।[১৭]
এই দ্বন্দ্বের ফলে এবং সোভিয়েতের কৃষি নীতির কারণে মধ্য এশিয়া একটি দুর্ভিক্ষের মুখে পড়ে এবং অসংখ্য প্রাণ হারায়।[১৮]
সোভিয়েত শাসন(১৯২০-১৯৯১)[সম্পাদনা]
১৯২৪ সালে তাজিক স্বতান্ত্রিক সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র সৃষ্টি হয় উজবেকিস্তানের একটি অংশ হিসাবে, কিন্তু ১৯২৮ সালের দিকে সীমান্ত নির্ধারণ করা হয়(প্রাশাসনিক সীমানির্ধারকালে) যেখানে প্রাচীন তাজিক শহর বুখারা এবং সমরকন্দকে তাজিকিস্তান এসএসআর এর বাইরে রাখা হয়। নতুন সৃষ্টি হওয়া উজবেক এসএসআর এর জনগণ হিসাবে অনেক তাজিকদের চাপ দেয়া ‘উজবেক’ হিসাবে পরিচয় মেনে চলার জন্য এবং প্রাণভয়ে অনেকেই বাধ্য হয় তাদের নিজেদের পরিচয় বদলাতে এবং ‘উজবেক’ হিসাবে পাসপোর্ট ব্যবহার করতে। তাজিক বিদ্যালয়গুলো বন্ধ হয়ে যায় এবং তাজিকরা কোনপ্রকার নেতৃত্ব পর্যায়ে নিযুক্ত করা হত শুধুমাত্র তাদের জাতিভুক্ততার কারণে। ১৯২৪ এবং ১৯৩৪ কৃষিতে যৌথীকরণ এবং দ্রুত কটন উৎপাদনের বৃদ্ধি পায়, বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলে।[১৯] সোভিয়েত যৌথীকরণ নীতি কৃষকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা নিয়ে আসে এবং পুরো তাজিকিস্তান জুড়ে পুনর্বাসন করতে বাধ্য হয়। এর সাথে কিছু কৃষক যৌথীকরণের বিরুদ্ধে লড়াই করেন এবং বাসমাখী আন্দোলনের পুনরুথান করেন। কিছু ছোট আকারের শিল্পোন্নত হয় সেসময়ে সেচ পরিকাঠামো সম্প্রসারণের সাথে।[১৯]
সরাসরি মস্কো হতে পরিচালনার মাধ্যমের দুই দফা (১৯২৭-১৯৩৪ এবং ১৯৩৭-১৯৩৮) সোভিয়েতকে পরিষ্কার করা হয়, ফলে তাজিকিস্তানের সাম্যবাদী দলের সকল স্তর থেকে প্রায় ১০০০০লোককে নির্বাসন করা হয়।[২০] জাতিগতভাবে রুশদের প্রেরণ করা হয় বহিষ্কৃত হওয়াদের স্থলে এবং এরি সাথে রুশরা দলীয় সকল পর্যায়ে আধিপত্য করে, উচ্চপর্যায় থেকে শুরু করে প্রথম সম্পাদক পদ পর্যন্ত।[২০] ১৯২৬ থেকে ১৯৫৯ সালের মধ্যবর্তী সময়ে তাজিকিস্থানের জনগণের মধ্যে রুশদের সংখ্যা ১% থেকে ১৩% পর্যন্ত বাড়ে।[২১] বুবুজন ঘাফুর্ভ তাজিকিস্তানের সাম্যবাদী দলের প্রথম সচিব ছিলেন ১৯৪৬-১৯৫৬ পর্যন্ত একমাত্র তাজিকিস্তানী রাজনীতিবিদ যে দেশের বাইরে সোভিয়েত সময়কালে তাৎপর্যপুর্ণ।[১৫] দপ্তরে তার উত্তরাধিকারীরা হল তার্সুন উলজাবায়দেভ (১৯৫৬-১৯৬১), জাব্বুর রাসুলভ (১৯৬১-১৯৮২), এবং রহমান নবীব(১৯৮২-১৯৮৫, ১৯৯১-১৯৯২)।
১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সোভিয়েত সেনাবাহীনেতে তাজিকদের অংশ নেয়া বাধ্যতামূলক করা হয় এবং প্রায় ২,৬০,০০০ তাজিক নাগরিক জার্মানি, ফিনল্যান্ড এবং জাপানের বিরুদ্ধে লড়াই করে। ৬০,০০০(৪%)[২২] এবং ১,২০,০০০(৮%)[২৩] এর মধ্যে তাজিকিস্তানের ১৫,৩০,০০০ তাজিক নাগরিকদের হত্যা করা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়।[২৪] যুদ্ধ পরবর্তি সময়ে এবং স্ট্যালিনের শাসনকালে তাজিকিস্তানের কৃষি এবং শিল্পের বিস্তার করার চেষ্টা করা হয়।[১৫] ১৯৫৭-১৯৫৮ এর দিকে নিকিতা ক্রুশ্চেভ এর কৃষি নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা তাজিকিস্তানের উপর বিশেষ দৃষ্টি দেয়, যেখানে বসবাস, শিক্ষা এবং শিল্পের অবস্থা সোভিয়েতে অন্যান্য রিপাবলিক অঞ্চল হতে পিছেয়ে ছিল।[১৫]
১৯৮০ এর দশকে ইউএসএসআর এর মধ্যে তাজিকিস্তানের সবচেয়ে কম পারিবারিক সঞ্চয় হার ছিল,[২৫] সর্বনিম্ন আয় শতকরা প্রতি পরিবারে,[২৬] এবং সবচেয়ে কম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর করেছিল প্রতি ১০০০জনের মধ্যে।[২৭]
জীবনযাত্রার মান হ্রাস পাচ্ছিল তাজিকিস্তান সাম্যবাদীদলের প্রথম সম্পাদকের দ্বয়িত্ব থাকা কাহার মাখামভ এর সময়কালে। মাখামভের তাজিক অর্থনৈতি বাণিজ্যিকরণের চেষ্টা অবস্থা অবনতি ঘটায় দরিদ্র বসবাস এবং বেকারত্বের। সোভিয়েত পতনের মুখে তাজিকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত ছিল এবং তা থেকে উদ্ধারের আশা একদম ক্ষীণ ছিল। মিখিল গর্ভাচেভের পরিবর্তনের প্রচরণা নীতি তাজিক জনগণের কন্ঠের মধ্যে আশা যোগায়। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন এর পতন ঘটে এবং তাজিকিস্তান স্বাধীন হিসাবে ঘোষিত হয়।
প্রজাতন্ত্রী তাজিকিস্তান(১৯৯১ থেকে বর্তমান)[সম্পাদনা]
তাজিকিস্তান সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র(এসএসআর) ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের শেষ প্রজাতন্ত্র যেটি স্বাধীন হিসাবে ঘোষণা দেয়। ১৯৯১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র ঐক্য (ইউএসএসআর) এর পতনের পর তাজিকিস্তান তাদের স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়। সেসময় তাজিক ভাষাতাজিকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া হয় তাজিকিস্তান এসএসআর এর রুশ ভাষার পাশাপাশি, এবং তাজিক ভাষা ব্যবহারের জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়। জাতিগতভাবে রুশ যারা সরকারি পদে ছিল তাদের অনেকেই স্থান হারায় এবং তাদের প্রভাব হারায় ও অসংখ্য তাজিক রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠে। দেশটি প্রায় সাথে সাথে গৃহযুদ্ধে পড়ে যার মধ্যে বিভিন্ন দল একে অপরের সাথে যুদ্ধ করছিল। এসকল দল মূলত বিভিন্ন গোত্রের আনুগত্য প্রকাশ করে। অমুসলিম, বিশেষ করে রুশ এবং ইহুদীরা সেসময় দেশটি থেকে পালিয়ে যায় নিপীড়নের কারণে, এছাড়াও দরিদ্রতা বৃদ্ধি এবং পশ্চিমা বা অন্যান্য সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র সমূহ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সুযোগের কারণে।
ইমোমলি রহমান ১৯৯৪ সালে ক্ষমতায় আসেন এবং আজকে পর্যন্ত শাসন করে আসছেন। তাজিকিস্তানের গৃহযুদ্ধ এর সময় জাতিগতভাবে দমন বিতর্কিত ছিল। যুদ্ধ শেষে তাজিকিস্তান সম্পূর্ণ বিধ্বংস ছিল। নিহতের সংখ্যা প্রায় ১,০০,০০০। ১.২ মিলিয়নের মত জনসংখ্যা শরণার্থী ছিল দেশটির ভিতরে এবং বাইরে।[২৮] ১৯৯৭ সালে, রহমান এবং বিরোধীদলসমূহ (তাজিক বিরোধী মহাজোট) এর মধ্যে শান্তিচুক্তি হয়। ১৯৯৯ সালে শান্তিপূর্নভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, কিন্তু বিরোধীদল থেকে বলা হয় যে সেটি পক্ষপাতদুষ্ট, এবং রহমান পুনঃনির্বাচিত হয় প্রায় সর্বসম্মতভাবে। রুশ সৈন্য তাজিকিস্তানের দক্ষিণদিকে ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করে, আফগানিস্থানের সাথে সীমান্ত পাহারা দেয়ার জন্য, যেটি ২০০৫ এর গ্রীষ্ম পর্যন্ত থাকে। ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর মার্কিন, ভারতীয় এবং ফ্রেঞ্চ সৈন্যও দেশটিতে ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করে।
রাশিয়ার উপস্থিতি[সম্পাদনা]
ঊনবিংশ শতাব্দীতে রাশিয়ার সম্রাটরা মধ্য এশিয়ায় তাদের সাম্রাজ্য বিস্তার করতে থাকেন। ১৮৬৪ এবং ১৮৮৫ সালের মধ্যে রাশিয়া উত্তরে বর্তমান কাজাখস্তান, পশ্চিমে কাস্পিয়ান সাগর পর্যন্ত এবং দক্ষিণে আফগানিস্তান সীমান্ত পর্যন্ত নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। ১৯১৭ সালে এ অঞ্চলে যখন রাশিয়ার ক্ষমতা কমিউনিস্টদের হাতে চলে যায়, তখন এ অঞ্চলের তুর্কিস্তানের অংশের ক্ষমতা দখল করে নেয় বলশেভিকরা। এ ক্ষোভ থেকেই বাসমাচি গোষ্ঠী গেরিলা কার্যক্রম শুরু করে। পরে তারা বলশেভিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং সোভিয়েত শাসনাধীন খিবা ও বোখারা জয় করে নেয়। কিন্তু এরপর বিভিন্ন কারণে তাদের এই স্বাধীনতা আন্দোলন ব্যর্থ হয়ে পড়ে। চার বছরব্যাপী এ যুদ্ধের পর বলশেভিক সৈন্যরা তাজিকিস্তানের গ্রাম ও মসজিদগুলো পুড়িয়ে দেয় এবং লোকজনকে ব্যাপক হারে গ্রেফতার করে। এর পর থেকে সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের প্রচারণা শুরু করে। এ সময় তারা ধর্মপ্রাণ মুসলমান, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের নির্যাতন করতে থাকে। একই সময় মসজিদ, চার্চ ও সিনাগগগুলোও বন্ধ করে দেয়া হয়।[৪]
সোভিয়েত তাজিকিস্তান[সম্পাদনা]
১৯২২ সালেই বাসমাচি আন্দোলন স্তব্ধ হয়ে গেলেও সোভিয়েত সরকার প্রতিবিপ্লব দমন করার জন্য মধ্য এশিয়াকে জাতিভিত্তিক পুনর্গঠন করার লক্ষ্যে উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান নামে দু’টি ইউনিয়ন প্রজাতন্ত্র স্থাপন করে। এ সময় তাজিক ও কিরগিজ নামের দুইটি স্বায়ত্তশাসিত প্রজাতন্ত্র স্থাপিত হলেও এগুলো ছিল উজবেক সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের অংশ। ১৯২৯ সালে তাজিকিস্তানকে পূর্ণাঙ্গ ইউনিয়ন সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে পরিণত করা হয়। এ সময়ে জীবনযাত্রার মান, শিক্ষা এবং শিল্প সব দিক দিয়েই তাজিকিস্তান সোভিয়েতের অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোর পেছনে পড়ে যায়। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এ অবস্থাই চলতে থাকে। ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাজিকিস্তান থেকে তার নিয়ন্ত্রণ গুটিয়ে নেয় এবং তাজিকিস্তান নিজেদের স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ১৯৯১ সালে ইরান সর্বপ্রথম তাজিকিস্তানকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তারাই প্রথম তাজিক রাজধানী দুশানবেতে তাদের দূতাবাস স্থাপন করে।[৪]
স্বাধীনতা-পরবর্তী অবস্থা[সম্পাদনা]
স্বাধীনতা পাওয়ার কিছু দিনের মধ্যেই তাজিকিস্তানের গোত্রগত দলাদলির কারণে দেশটি গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এ সময় অমুসলিম নাগরিক বিশেষ করে ইহুদি এবং রুশরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। নির্যাতন ও দারিদ্র্যের আশঙ্কা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির আশায় তারা পাশের অন্যান্য প্রাক্তন সোভিয়েত দেশে পালিয়ে যায়। ১৯৯৪ সালের নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এমোমালি রেহমান তার পূর্বসূরি আব্দুল মালিক আব্দুল্লাহ জানবকে পরাজিত করে ক্ষমতায় আসেন। ১৯৯৯ সালের নির্বাচনে রেহমান ৯৮ শতাংশ ভোটে এবং ২০০৬ সালের নির্বাচনে তৃতীয়বারের মতো ৭৯ শতাংশ ভোট নিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হন।[৪]
রাজনীতি[সম্পাদনা]
তাজিকিস্তানের রাজনীতি একটি রাষ্ট্রপতিশাসিত প্রজাতন্ত্র কাঠামোয় সংঘটিত হয়। রাষ্ট্রপতি হলেন একাধারে রাষ্ট্রের প্রধান ও সরকারপ্রধান। আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সরকার এবং ৬৩ সদস্যবিশিষ্ট দ্বিকাক্ষিক আইনসভা উভয়ের উপর ন্যস্ত। ২০০৩ সালের নতুন সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ৭ বছর মেয়াদের জন্য জনগনের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন। ২০০৬ সালে এমোমালি রাহমন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তবে তিনি ১৯৯৪ সাল থেকেই দেশটির শাসক। প্রধানমন্ত্রীর পদের তেমন কোন ক্ষমতা নেই। সংবিধান অনুসারে বিচার বিভাগ সরকার থেকে স্বাধীন।
প্রশাসনিক অঞ্চলসমূহ[সম্পাদনা]
ভূগোল[সম্পাদনা]
তাজিকিস্তান স্থলবেষ্টিত এবং আয়তনে মধ্য এশিয়ার সবচেয়ে ক্ষুদ্রত্তম রাষ্ট্র। এটি মূলত ৩৬° উত্তর অক্ষাংশ থেকে ৪১° উত্তর অক্ষাংশ এবং ৬৭° পূর্ব দ্রাঘিমাংশ থেকে ৭৫° পূর্ব দ্রাঘিমাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত। পামির পর্বতাঞ্চল দ্বারা বেষ্টিত দেশটির পঞ্চাশ শতাংশেরও বেশি জায়গা সমুদ্র থেকে ৩০০০ মিটারেরও বেশি উচ্চতায় অবস্থিত। দেশটির গুরুত্বপূর্ণ নিম্নভূমির মধ্যে রয়েছে উত্তরাঞ্চলের ফের্গানা উপত্যকা এবং দক্ষিণাঞ্চলের কোফারনিহন ও ভাক্শ নদীর উপত্যকা সমূহ যেটি থেকে আমু দরিয়ার উৎপত্তি হয়েছে। কোফারনিহন উপত্যকার দক্ষিণের ঢালে রাজধানী দুশানবে অবস্থিত।
তাজিকিস্তানের ৯০%-এরও বেশি এলাকা পর্বতময়। পামির পর্বতমালা এবং আলায় পর্বতমালা দুইটি প্রধান পর্বতমালা, এবং এগুলির হিমবাহ থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন পার্বত্য জলধারা ও নদী প্রাচীনকাল থেকে ঐ অঞ্চলের খামারভূমিতে সেচ কাজে ব্যবহার করা হয়ে এসেছে। তাজিকিস্তানের উত্তর প্রান্তে মধ্য এশিয়ার আরেক প্রধান পর্বতমালা তিয়ান শান পর্বতমালার একাংশ চলে গেছে। পর্বতগুলির উত্তরে ও দক্ষিণে রয়েছে দুইটি নিম্নভূমি অঞ্চল এবং এখানেই তাজিকিরা ব্যাপক পরিমাণে বাস করে।
মধ্য এশিয়ার সবচেয়ে জনবহুল এলাকা সির দরিয়া নদীবিধৌত ফের্গানা উপত্যকার একাংশ উত্তর তাজিকিস্তানে পড়েছে। এই দীর্ঘ উপত্যকাটি উত্তরে কুরামিন পর্বতমালা ও দক্ষিণে তুর্কেস্তান পর্বতমালার মধ্যে অবস্থিত।
দক্ষিণের নিম্নভূমি এলাকাটিতে আমু দরিয়া ও পাঞ্জ নদী প্রধান দুইটি নদী। নদী দুইটি আফগানিস্তানের সাথে সীমান্ত চিহ্নিত করে আছে। এছাড়া দেশটিতে ১০ কিলোমিটার এর চেয়ে দীর্ঘ এরকম প্রায় ৯০০ এর বেশি নদ-নদী রয়েছে।
অর্থনীতি[সম্পাদনা]
মধ্য এশিয়ার দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোর অন্যতম হচ্ছে তাজিকিস্তান। দেশটির বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থানও তেমন একটা সুবিধাজনক স্থানে নেই। অর্থনৈতিক খাতে ব্যাপক দুর্নীতি, সংস্কারের ক্ষেত্রে অপূর্ণতা এবং অব্যবস্থাপনাকেই এর জন্য মূল দায়ী হিসেবে ধারণা করা হয়। ২০০১ সালে দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থা এতটাই খারাপের দিকে চলে যায় যে, সে বছরের ২১ আগস্ট রেড ক্রস দেশটিকে দুর্ভিক্ষ আক্রান্ত দেশ বলে ঘোষণা করে দেশটির জন্য আন্তর্জাতিক সাহায্য প্রার্থনা করে। পরবর্তী বছরগুলোতে তাজিকিস্তান কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে এবং পার্শ্ববর্তী তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তানের চেয়ে ভালো অবস্থানে পৌঁছে যায়।[৪]
সম্প্রতি দেশটিতে আনজাব টানেল নির্মাণ শেষ হয়েছে, যা পর্বতময় দেশটির উত্তরাঞ্চলের সাথে রাজধানীর যোগাযোগকে সহজ করবে। এ টানেলটি ইরান ও আফগানিস্তানের সাথে দেশটির যোগাযোগের জন্য রাস্তার অংশ হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। আর এ বিষয়টি দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থাকে আরো সমৃদ্ধ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় তাজিকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে একটি ব্রিজ নির্মিত হয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার সাথে তাজিকিস্তানের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে মজবুত করতে সাহায্য করবে। দেশটির অর্থ খাতের প্রধান ভূমিকা পালনকারী বিষয়গুলো হচ্ছে অ্যালুমিনিয়াম ও তুলা এবং প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স। রাষ্ট্র পরিচালিত অ্যালুমিনিয়াম ফ্যাক্টরি ট্যালকো মধ্য এশিয়ার বৃহত্তম অ্যালুমিনিয়াম কোম্পানি। এ ছাড়া দেশটি হাইড্রোইলেকট্রিক শক্তি উৎপাদনে বিশ্বে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এ খাতে দেশটিতে রাশিয়া, চীন ও ইরান অর্থ বিনিয়োগ করছে।[৪]
তাজিকিস্তানের অর্থনীতিতে প্রবাসী বিশেষ করে রাশিয়াতে বসবাসকারী তাজিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স বড় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। গত কয়েক বছরের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে এর অবদান অসামান্য। বৈধ আয়ের পাশাপাশি তাজিকিস্তানে অবৈধ অর্থের আমদানিও রয়েছে বেশ। মাদক উৎপাদন ও পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে তাজিকিস্তান এ খাতে প্রচুর অর্থ আয় করে থাকে। এ অর্থ তাজিকিস্তানের সরকার প্রশাসনকেও প্রভাবিত করে থাকে। সরকারের প্রভাবশালী কয়েকজন সদস্য এর সাথে জড়িত থাকায় দেশটি মাদকচক্র থেকে মুক্ত হতে পারছে না। তার পরও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রচেষ্টায় সাম্প্রতিক সময়ে এ প্রবণতা কিছুটা কমেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।[৪]
জনসংখ্যা[সম্পাদনা]
৮,৭৩৪,৯৫১[৭] জনসংখ্যার দেশ তাজিকিস্তানে তাজিক ভাষাভাষী লোকরাই মূলত দেশটির মূল অধিবাসী। দেশের জনসংখ্যার বেশির ভাগটাই তাদের দখলে। এ ছাড়া দেশটিতে রাশান ও উজবেকও রয়েছে যৎসামান্য। বাদাখশানের পামিরি, কিছুসংখ্যক যাঘনোবি এবং নগণ্য সংখ্যক ইসমায়িলিরাও বৃহৎ তাজিক জনগোষ্ঠির অন্তর্গত বলে ধরা হয়। তবে তাজিকিস্তানে বসবাসকারী সবাইকেই তাজিক বলেই পরিচয় দেয়া হয়। দেশটির দশ লাখ লোক বর্তমানে অন্য দেশে কর্মরত রয়েছে।[৪]
ভাষা[সম্পাদনা]
তাজিক ভাষা ও রুশ ভাষা তাজিকিস্তানের সরকারি ভাষা। এদের মধ্যে তাজিক ভাষাতে প্রায় ৬২% লোক এবং রুশ ভাষাতে প্রায় ৫% লোক কথা বলেন। তাজিকিস্তানে প্রচলিত অন্যান্য ভাষাগুলির মধ্যে আছে উজবেক ভাষা (১৬% বক্তা), ফার্সি ভাষা এবং পশতু ভাষা।
ধর্ম[সম্পাদনা]
তাজিকিস্তানে ২০০৯ সালে ইসলামকে সরকারি ধর্ম হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] এ বিষয়টি সাবেক সোভিয়েত দেশগুলোর মধ্যে তাজিকিস্তানকে আলাদা করে তুলেছে। তবে তাজিকিস্তানে অন্য যেকোনো ধর্ম পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। ২০০৯ সালের তথ্যানুসারে দেশটির ৯৮ শতাংশ লোক মুসলমান। এদের মধ্যে ৯৫ শতাংশ সুন্নি এবং ৩ শতাংশ শিয়া মুসলমান। আর বাকি দুই শতাংশের মধ্যে অর্থোডক্স, প্রোটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথলিক খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ও ইহুদি রয়েছে। তাজিকিস্তানের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও অধিকার ভোগ করতে ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোকে নিবন্ধন করতে হয়। এই নিবন্ধন ছাড়া কোনো দল উপসনার জন্য একত্রিত হতে পারবে না। এর ব্যতিক্রম করলে বড় অঙ্কের জরিমানার পাশাপাশি তাদের উপাসনাস্থল বন্ধ করে দেয়া হয়।[৪]
স্বাস্থ্য[সম্পাদনা]
তাজিকিস্তানের সরকারের অব্যাহত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও দেশটি স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা খাতে বেশ দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। ২০০০ সালের হিসাব অনুযায়ী দেশটিতে প্রতি এক লাখ লোকের জন্য চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র ২০৩ জন। দেশটিতে মৃত্যুহার হাজারে ৫৯ জন। পুরো বিশ্ব থেকে পোলিও প্রায় নির্মূল হলেও তাজিকিস্তানে এ রোগটি বাড়ছেই। ২০০৮-০৯ সালে শূন্যের কোঠায় থাকলেও ২০১০ সালে দেশটিতে পোলিও রোগীর পরিমাণ ছিল ১৪১ জন, যখন পুরো বিশ্বে এ রোগীর পরিমাণ ছিল ২৩৭ জন।[৪]
শিক্ষা[সম্পাদনা]
দেশটি ২০০২ সাল থেকে তার জিডিপি’র ৩.৫ শতাংশ শিক্ষা খাতে খরচ করে আসছে। তবে এর পরও সার্বিকভাবে দেশটির শিক্ষা খাতকে তেমন উন্নত বলা যায় না। ইউনিসেফের দেয়া এক তথ্যমতে দারিদ্র্য এবং লিঙ্গবৈষম্যের কারণে প্রতি বছর ২৫ শতাংশ মেয়েশিশু প্রাইমারি শিক্ষা সমাপ্ত করতে পারে না। তার আগেই তারা ঝরে যায়। তবে সব কিছু ছাপিয়েও তাজিকদের যে বিষয়টি গর্ব করার মতো তা হলো দেশটির ৯৯.৫ শতাংশ লোক লিখতে ও পড়তে পারে।[৪]
সংস্কৃতি[সম্পাদনা]
ঐতিহাসিকভাবেই তাজিক এবং পার্সিয়ানরা একই ভাবধারার। তাদের ভাষাও কাছাকাছি পর্যায়ের। দেশটির ৮০ শতাংশ লোকেরই মাতৃভাষা তাজিক। বর্তমানে দেশটির রাজধানী দুশানবে, খুজান্দ, দুলব, পাঞ্জাকেন্ট এবং ইস্তারভশান প্রধান এলাকা হিসেবে পরিচিত। উত্তর তাজিকিস্তানে ২৫ হাজার লোক রয়েছে ইয়াগনোবি সম্প্রদায়ের। তারা ইয়াগনোবি ভাষাতেই কথা বলে থাকে।[৪]
খেলাধুলা[সম্পাদনা]
পর্বতময় তাজিকিস্তানের খেলাধুলাও পাহাড়পর্বতকেন্দ্রিক। পাহাড়ে হাঁটা, উঁচু পাহাড়ে আরোহণ করা ইত্যাদিই এখানকার প্রধান খেলা হিসেবে পরিচিত। প্রতি মৌসুমে স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্বত এজেন্সিগুলো বিভিন্ন খেলার আয়োজন করে থাকে। এর পাশাপাশি দেশটিতে ফুটবলও একটি জনপ্রিয় খেলা। তারা ফিফা ও এএফসি আয়োজিত বিভিন্ন খেলায় অংশ নিয়ে থাকে।[৪]
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন