বিদেশে কর্মরত অবস্থায় বা বিদেশে থাকা অবস্থায় আপনার বাংলাদেশি পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হলে কী করবেন?
আপনি যেহেতু বিদেশে আছেন এবং আপনার বাংলাদেশি পাসপোর্ট নবায়ন করতে হবে, আমি আপনাকে ধাপে ধাপে বিস্তারিত প্রক্রিয়াটি বলছি। বিদেশে অবস্থিত আপনার নিকটস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেটের মাধ্যমে আপনাকে এই কাজটি করতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কীকরণ:
আপনি যখন এই কাজটি করবেন, তখন অবশ্যই সংশ্লিষ্ট বিষয়ের মূল কর্তৃপক্ষ (যেমন: বাংলাদেশ ই-পাসপোর্ট পোর্টাল) এবং আপনি যে দেশে অবস্থান করছেন, সেই দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস/কনস্যুলেটের মূল ওয়েবসাইট দেখে ওই সময়ের নিয়মটিকে অবশ্যই ফলো করবেন। আমাদের এই নিয়মটি বর্তমান সময় (১১ জুলাই ২০২৫) পর্যন্ত প্রযোজ্য। ভবিষ্যতে নিয়মাবলী পরিবর্তিত হতে পারে, তাই আবেদন করার সময় অবশ্যই সঠিক কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইট ফলো করবেন।
ধাপ ১: অনলাইনে আবেদন (Online Application)
বর্তমানে, বাংলাদেশ সরকার ই-পাসপোর্ট চালু করেছে। বিদেশে বসে পাসপোর্ট নবায়নের জন্যও আপনাকে প্রথমে অনলাইনে আবেদন করতে হবে।
ওয়েবসাইটে প্রবেশ: বাংলাদেশ ই-পাসপোর্ট পোর্টালে যান। ঠিকানা হলো: https://www.epassport.gov.bd/
নতুন অ্যাকাউন্ট তৈরি/লগইন:
যদি আপনার আগে কোনো অ্যাকাউন্ট না থাকে, তাহলে "Apply Online" বা "Register"
অপশনে ক্লিক করে একটি নতুন অ্যাকাউন্ট তৈরি করুন। আপনার ইমেইল আইডি এবং একটি পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে রেজিস্ট্রেশন করুন।
যদি আগে অ্যাকাউন্ট থেকে থাকে, তাহলে সরাসরি লগইন করুন।
আবেদন ফর্ম পূরণ:
লগইন করার পর "Apply for a new e-Passport/Reissue of e-Passport" অপশনটি নির্বাচন করুন।
আপনার ব্যক্তিগত তথ্য, বর্তমান পাসপোর্টের তথ্য (যা মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে), এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য সঠিকভাবে পূরণ করুন। এখানে আপনার নাম, ঠিকানা, জন্ম তারিখ, পেশা,
বিদেশে আপনার বর্তমান ঠিকানা ইত্যাদি সতর্কতার সাথে লিখুন।
গুরুত্বপূর্ণ: "Application Type" হিসেবে "Reissue" (পুনরায় ইস্যু) এবং
"Passport Type" হিসেবে "Ordinary" (সাধারণ) নির্বাচন করুন।
"Present Address" অংশে আপনার বিদেশের বর্তমান ঠিকানা লিখুন এবং "Permanent Address" অংশে বাংলাদেশের স্থায়ী ঠিকানা লিখুন।
আপনি যে দূতাবাস/মিশনে আবেদন করবেন, সেটি নির্বাচন করুন (যেমন: "Italy, Rome (Embassy of Bangladesh, Rome)" অথবা "USA, Washington D.C. (Embassy of Bangladesh, Washington D.C.)" ইত্যাদি)। আপনি যেখানে থাকেন, তার কাছাকাছি
দূতাবাস/কনস্যুলেট নির্বাচন করাই ভালো।
পেমেন্ট পদ্ধতি নির্বাচন:
অনলাইন আবেদন ফর্মে পেমেন্টের অপশন থাকবে। বিদেশে পেমেন্ট সাধারণত ব্যাংক ড্রাফট (Bank Draft) বা পে-অর্ডার (Pay Order) এর মাধ্যমে হয়, যা দূতাবাস/কনস্যুলেটের নামে ইস্যু করতে হয়। অথবা, কিছু ক্ষেত্রে সরাসরি দূতাবাসে ক্যাশ পেমেন্টেরও সুযোগ থাকে। আবেদন ফরম পূরণের সময় পেমেন্ট অপশনগুলো ভালোভাবে দেখে নিন এবং দূতাবাসের ওয়েবসাইটে পেমেন্টের সর্বশেষ নিয়মাবলী যাচাই করুন।
জরুরী পরামর্শ: পেমেন্ট করার আগে অবশ্যই দূতাবাস/কনস্যুলেটের ওয়েবসাইটে পাসপোর্ট ফি এবং পেমেন্টের সর্বশেষ নিয়মাবলী দেখে নিন। অনেক সময় ফি পরিবর্তন হয়।
আবেদন ফর্ম সংরক্ষণ ও প্রিন্ট:
ফর্ম পূরণ শেষ হলে, একটি অ্যাপ্লিকেশন সামারি (Application Summary) দেখতে পাবেন। এটি ভালো করে দেখে নিন, কোনো ভুল থাকলে সংশোধন করুন।
সব ঠিক থাকলে, অ্যাপ্লিকেশনটি সেভ (Save) করুন এবং এর পিডিএফ কপি (PDF Copy) ডাউনলোড করে প্রিন্ট (Print) করে নিন। এটি আপনার অনলাইন আবেদনের প্রমাণ।
ধাপ ২: দূতাবাসে কাগজপত্র জমা দেওয়া ও বায়োমেট্রিক তথ্য প্রদান
অনলাইন আবেদন সম্পন্ন করার পর, আপনাকে আপনার নির্বাচিত দূতাবাস/কনস্যুলেটে সশরীরে উপস্থিত হয়ে কাগজপত্র জমা দিতে হবে এবং বায়োমেট্রিক তথ্য (আঙ্গুলের ছাপ, ছবি, স্বাক্ষর) প্রদান করতে হবে।
নিয়োগ/অ্যাপয়েন্টমেন্ট (Appointment) নেওয়া:
বেশিরভাগ দূতাবাস/কনস্যুলেটে কাগজপত্র জমা দেওয়ার জন্য আগে থেকে অনলাইন বা ফোন
করে একটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হয়। দূতাবাসের ওয়েবসাইটে এর নির্দেশনা পেয়ে যাবেন। অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া গেলে হয়তো সেবা নাও পেতে পারেন।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুতকরণ: দূতাবাসে যাওয়ার আগে নিচের ডকুমেন্টগুলো গুছিয়ে নিন:
অনলাইন আবেদন ফর্মের প্রিন্ট কপি: আপনি যে ফর্মটি অনলাইনে পূরণ করে প্রিন্ট করেছেন, সেটি।
বর্তমান মেয়াদোত্তীর্ণ/মেয়াদ শেষের পথে থাকা পাসপোর্ট: মূল কপি এবং ডাটা পৃষ্ঠার (যে পৃষ্ঠায় আপনার ছবি ও তথ্য আছে) ফটোকপি।
জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) / জন্ম নিবন্ধন সনদ: মূল কপি এবং ফটোকপি। যদি আপনার এনআইডি/জন্ম নিবন্ধন না থাকে, তাহলে অনলাইনে আবেদনের সময় সেই অপশন নির্বাচন করতে হয়।
বিদেশের রেসিডেন্স পারমিট / আইডি কার্ড: মূল কপি এবং ফটোকপি।
পাসপোর্ট সাইজের ছবি: (সাধারণত ১-২ কপি, যা অনলাইনে আপলোড করা ছবির অনুরূপ)।
পেমেন্টের প্রমাণ: ব্যাংক ড্রাফট/পে-অর্ডার (যদি অনলাইনে পেমেন্ট না করে থাকেন) বা ক্যাশ পেমেন্টের রসিদ।
পেশার প্রমাণপত্র (যদি প্রযোজ্য হয়): কর্মসংস্থান ভিসার ক্ষেত্রে কর্মস্থল থেকে NOC (No Objection Certificate) বা চাকরির প্রমাণপত্র লাগতে পারে।
ঠিকানার প্রমাণ (বিদেশের): যেমন, ইউটিলিটি বিল (বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি) বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের চিঠি।
অতিরিক্ত ফি-এর রসিদ (যদি প্রযোজ্য হয়): যদি পাসপোর্ট মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর অতিরিক্ত সময় পার হয়ে যায়, তাহলে অতিরিক্ত ফি বা জরিমানা লাগতে পারে।
দূতাবাসে সশরীরে উপস্থিত হওয়া:
আপনার নির্ধারিত অ্যাপয়েন্টমেন্টের দিনে সব কাগজপত্র নিয়ে দূতাবাস/কনস্যুলেটে উপস্থিত হন।
কর্মকর্তারা আপনার কাগজপত্র যাচাই করবেন।
আপনার আঙ্গুলের ছাপ (Fingerprint), ডিজিটাল ছবি (Digital Photograph) এবং ডিজিটাল স্বাক্ষর (Digital Signature) নেওয়া হবে।
সব প্রক্রিয়া শেষ হলে, আপনাকে একটি ডেলিভারি স্লিপ (Delivery Slip) দেওয়া হবে। এটি ভবিষ্যতের যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ধাপ ৩: পাসপোর্ট সংগ্রহ
পাসপোর্ট প্রস্তুত হলে দূতাবাস থেকে আপনাকে সাধারণত এসএমএস বা ইমেইলের মাধ্যমে জানানো হবে। ডেলিভারি স্লিপ দেখিয়ে এবং আপনার পরিচয়পত্র যাচাই করে আপনি নতুন পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে পারবেন।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ অতিরিক্ত পরামর্শ:
দূতাবাসের ওয়েবসাইট অনুসরণ করুন: আপনি যে দেশে অবস্থান করছেন, সেই দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেট জেনারেলের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট নিয়মিত ভিজিট করুন। পাসপোর্ট নবায়নের সর্বশেষ নিয়মাবলী, প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট, ফি এবং অ্যাপয়েন্টমেন্টের পদ্ধতি সেখানে বিস্তারিতভাবে দেওয়া থাকে। নিয়মাবলী প্রায়শই পরিবর্তিত হতে পারে।
হেল্পলাইন/ইমেইল: কোনো ধাপে আটকে গেলে বা স্পষ্টতা না পেলে, দূতাবাসের হেল্পলাইন নম্বরে ফোন করুন বা ইমেইল করুন।
সময়সীমা: ই-পাসপোর্ট প্রক্রিয়াকরণে সাধারণত ২-৪ সপ্তাহ সময় লাগে, তবে এটি কাজের চাপের উপর নির্ভর করে কম বা বেশি হতে পারে। জরুরি প্রয়োজনে কিছু অতিরিক্ত ফি দিয়ে দ্রুত প্রক্রিয়াকরণের সুযোগ থাকতে পারে।
মেয়াদোত্তীর্ণের পর: যদি আপনার পাসপোর্টের মেয়াদ অনেক দিন আগে শেষ হয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে আপনাকে জরিমানাসহ আবেদন করতে হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে, আপনার পুরনো পাসপোর্টের মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ থেকে ই-পাসপোর্ট ইস্যুর তারিখ পর্যন্ত একটি 'ওভারস্টে ফি' প্রযোজ্য হতে পারে।
এই ধাপগুলো অনুসরণ করলে আপনি বিদেশে বসেই আপনার বাংলাদেশি পাসপোর্ট সফলভাবে নবায়ন করতে পারবেন।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন