বৃহস্পতিবার, ১০ জুলাই, ২০২৫

বাংলাদেশে বিদেশী কর্মী নিয়োগ: বাংলাদেশী কোম্পানির জন্য করণীয়

বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো বিদেশি নাগরিককে কর্মে নিযুক্ত করা যায় না। আপনার ক্লায়েন্টকে জানানোর জন্য নিচে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হলো:


বাংলাদেশে বিদেশী কর্মী নিয়োগ: বাংলাদেশী কোম্পানির জন্য করণীয়

একটি বাংলাদেশী কোম্পানি হিসেবে আপনি যখন কোনো বিদেশি নাগরিককে আপনার প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দিতে চান, তখন আপনাকে বাংলাদেশের শ্রম আইন, ভিসা নীতিমালা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। এই প্রক্রিয়াটি বেশ কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়।

১. কেন বিদেশী কর্মী নিয়োগ? (যুক্তিযুক্ত কারণ প্রদর্শন)

প্রথমত, আপনাকে সরকারকে বোঝাতে হবে যে কেন আপনার এই পদে একজন বিদেশি কর্মীর প্রয়োজন। বাংলাদেশের নীতি হলো, যদি স্থানীয়ভাবে যোগ্য কর্মী পাওয়া যায়, তবে বিদেশি কর্মী নিয়োগ নিরুৎসাহিত করা হয়। তাই আপনাকে প্রমাণ করতে হবে যে:

  • আপনার প্রতিষ্ঠানের জন্য যে বিশেষ দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা প্রয়োজন, তা বাংলাদেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যাচ্ছে না।

  • আপনি স্থানীয়ভাবে কর্মী নিয়োগের জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন (যেমন: বিজ্ঞাপন দিয়েছেন, ইন্টারভিউ নিয়েছেন) কিন্তু যোগ্য প্রার্থী পাননি।

  • বিদেশী কর্মী নিয়োগ আপনার কোম্পানির জন্য অপরিহার্য, যেমন: উচ্চ কারিগরি দক্ষতা, বিশেষজ্ঞ জ্ঞান, বিশেষ ভাষার দক্ষতা, আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কিং ইত্যাদি।

২. সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসমূহ

বিদেশী কর্মী নিয়োগ এবং ওয়ার্ক পারমিট (কাজের অনুমতি) প্রাপ্তির জন্য প্রধানত নিম্নলিখিত কর্তৃপক্ষগুলোর সাথে আপনাকে কাজ করতে হবে:

  • বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BIDA - Bangladesh Investment Development Authority): বেশিরভাগ বাণিজ্যিক ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য বিডা ওয়ার্ক পারমিট ইস্যু করে।

  • বাংলাদেশ এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনস অথরিটি (BEPZA - Bangladesh Export Processing Zones Authority): যদি আপনার প্রতিষ্ঠান রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (EPZ) আওতাভুক্ত হয়।

  • এনজিও বিষয়ক ব্যুরো (NGO Affairs Bureau): যদি আপনার প্রতিষ্ঠান কোনো আন্তর্জাতিক বা স্থানীয় এনজিও হয়।

  • স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (Ministry of Home Affairs): ভিসা সুপারিশ এবং নিরাপত্তা ছাড়পত্রের জন্য।

  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR - National Board of Revenue): আয়কর সংক্রান্ত বিষয়ে।

  • পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (Ministry of Foreign Affairs): বিদেশী কর্মীদের নিজ দেশের দূতাবাস বা কনস্যুলেটের সাথে যোগাযোগের জন্য।

৩. নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং ওয়ার্ক পারমিট প্রাপ্তির ধাপসমূহ

একটি বিদেশী কর্মীকে বৈধভাবে নিয়োগের জন্য আপনাকে নিম্নলিখিত প্রধান ধাপগুলো অনুসরণ করতে হবে:

ধাপ ১: ওয়ার্ক পারমিটের জন্য আবেদন (নিয়োগকারী কোম্পানি কর্তৃক):

  • আবেদন: আপনার কোম্পানিকে বিডা (বা বেপজা/এনজিও ব্যুরো) বরাবর একটি লিখিত আবেদন করতে হবে। এই আবেদনে বিদেশী কর্মীর নিয়োগের কারণ, পদের প্রয়োজনীয়তা, স্থানীয় কর্মী না পাওয়ার যুক্তি ইত্যাদি উল্লেখ করতে হবে।

  • প্রয়োজনীয় কাগজপত্র (কোম্পানির পক্ষ থেকে):

    • কোম্পানির নিবন্ধন সনদ (Certificate of Incorporation)।

    • ট্রেড লাইসেন্স।

    • টিআইএন (TIN) সার্টিফিকেট।

    • ভ্যাট নিবন্ধন (VAT Registration)।

    • কোম্পানির মেমোরেন্ডাম অ্যান্ড আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশন (Memorandum & Articles of Association)।

    • কোম্পানির সর্বশেষ অডিট রিপোর্ট।

    • বোর্ড রেজুলেশন (Board Resolution) যেখানে বিদেশী কর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়েছে।

    • যে পদে বিদেশী কর্মী নিয়োগ করা হবে, সে পদের জন্য স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞাপনের কপি এবং স্থানীয় কর্মী না পাওয়ার যৌক্তিক ব্যাখ্যা।

    • বিদেশী কর্মীর নিয়োগপত্র (Offer Letter/Appointment Letter)।

    • বিদেশী কর্মীর বেতনের বিস্তারিত বিবরণ।

    • কোম্পানির প্রোফাইল।

ধাপ ২: ভিসা সুপারিশের জন্য আবেদন (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় / বিডা):

  • ওয়ার্ক পারমিটের প্রাথমিক অনুমোদন বা সুপারিশ পাওয়ার পর, বিদেশী কর্মীর ভিসার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা বিডা থেকে একটি ভিসা সুপারিশ পত্র সংগ্রহ করতে হবে।

  • এই সুপারিশ পত্রটি বিদেশী কর্মীর নিজ দেশে অবস্থিত বাংলাদেশী দূতাবাসে জমা দেওয়া হবে।

ধাপ ৩: এমপ্লয়মেন্ট ভিসা (বিদেশী কর্মী কর্তৃক):

  • বিদেশী কর্মীকে তার নিজ দেশে অবস্থিত বাংলাদেশী দূতাবাস/হাই কমিশন/কনস্যুলেটে ওয়ার্ক পারমিটের সুপারিশপত্র, নিয়োগপত্র এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সহ এমপ্লয়মেন্ট ভিসার (E Visa) জন্য আবেদন করতে হবে।

  • বিদেশী কর্মীর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র:

    • বৈধ পাসপোর্ট (কমপক্ষে ৬ মাস মেয়াদ)।

    • ভিসা আবেদন ফরম (অনলাইনে পূরণকৃত)।

    • পাসপোর্ট সাইজের ছবি।

    • শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্র।

    • অভিজ্ঞতার সনদপত্র।

    • নিয়োগপত্রের কপি।

    • কাজের চুক্তিপত্র (যদি থাকে)।

    • পূর্বের ওয়ার্ক পারমিট (যদি থাকে)।

    • চিকিৎসা সনদ (কিছু ক্ষেত্রে)।

    • পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট (কিছু ক্ষেত্রে)।

ধাপ ৪: বাংলাদেশে আগমন ও চূড়ান্ত ওয়ার্ক পারমিট প্রাপ্তি:

  • এমপ্লয়মেন্ট ভিসা নিয়ে বিদেশী কর্মী বাংলাদেশে প্রবেশ করার পর, তাকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের (যেমন: বিডা) নিকট 'ওয়ার্ক পারমিট' এর জন্য আবেদন করতে হবে।

  • স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ছাড়পত্র (Security Clearance) প্রাপ্তি সাপেক্ষে বিদেশী নাগরিককে নির্ধারিত সময়ের জন্য ওয়ার্ক পারমিট দেওয়া হবে।

  • প্রাথমিকভাবে, ওয়ার্ক পারমিট সাধারণত ১ থেকে ২ বছরের জন্য ইস্যু করা হয়, যা পরবর্তীতে নবায়ন করা যেতে পারে। ই পি জেডের ক্ষেত্রে এটি ৫ বছর পর্যন্ত হতে পারে।

৪. ওয়ার্ক পারমিট নবায়ন প্রক্রিয়া

ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৩ মাস পূর্বে নবায়নের জন্য আবেদন করতে হয়। নবায়নের ক্ষেত্রে কোম্পানির সন্তোষজনক পারফরমেন্স এবং বিদেশী কর্মীর কাজের মূল্যায়ন বিবেচনা করা হয়।

৫. খরচ (ফি)

ওয়ার্ক পারমিট এবং ভিসা প্রক্রিয়ার জন্য কিছু সরকারি ফি প্রযোজ্য।

  • ওয়ার্ক পারমিট ফি: এটি নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের ধরন এবং ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদের উপর। উদাহরণস্বরূপ, ৪ বছরের জন্য নবায়নের ক্ষেত্রে প্রতি বছর ৫০০০ টাকা হারে ২০০০০ টাকা ফি লাগতে পারে (যেমন বেজার ক্ষেত্রে)।

  • ভিসা ফি: এটি নির্ভর করে বিদেশী কর্মীর দেশের উপর।

  • অন্যান্য খরচ: ডকুমেন্ট প্রসেসিং, অ্যাটেস্টেশন, এবং অন্যান্য সার্ভিস চার্জ থাকতে পারে।

৬. কোম্পানির দায়িত্ব ও বাধ্যবাধকতা

বিদেশী কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশী কোম্পানির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও বাধ্যবাধকতা রয়েছে:

  • আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ: সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া ও নিয়মাবলী কঠোরভাবে অনুসরণ করা।

  • আয়কর প্রদান: বিদেশী কর্মীর আয়কর সঠিকভাবে কেটে রাখা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী তা পরিশোধ করা। আয়কর আইন অনুযায়ী তাদেরকে নির্দিষ্ট পরিমাণ কর প্রদান করতে হয়।

  • তথ্য সংরক্ষণ: বিদেশী কর্মীদের সমস্ত তথ্য সরকারের কাছে হালনাগাদ রাখা।

  • নিরাপত্তা ছাড়পত্র: বিদেশী কর্মীর জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ছাড়পত্র নিশ্চিত করা।

  • ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ: বিদেশী কর্মীর ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নবায়নের ব্যবস্থা করা।

  • ভিসার শর্ত মেনে চলা: নিশ্চিত করা যে বিদেশী কর্মী তার ভিসার শর্ত ভঙ্গ করছেন না (যেমন: যে কাজের জন্য ওয়ার্ক পারমিট নেওয়া হয়েছে, সেই কাজই করছেন এবং নির্ধারিত প্রতিষ্ঠানেই করছেন)। শর্ত ভঙ্গ হলে কালো তালিকাভুক্ত করে ফেরত পাঠানোর বিধান রয়েছে।

  • কাজের পরিবেশ: বিদেশী কর্মীর জন্য একটি নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা।

  • বেতন ও সুবিধা: নিয়োগচুক্তি অনুযায়ী বেতন ও অন্যান্য সুবিধা প্রদান করা।

৭. অন্যদের অভিজ্ঞতা এবং গুরুত্বপূর্ণ টিপস

অনেক কোম্পানি সফলভাবে বাংলাদেশে বিদেশী কর্মী নিয়োগ করে থাকে, বিশেষ করে যেখানে উচ্চ দক্ষতার প্রয়োজন হয় (যেমন: টেক্সটাইল শিল্প, বিদ্যুৎ খাত, বহুজাতিক কোম্পানি, আইটি)। তবে কিছু সাধারণ অভিজ্ঞতা এবং টিপস নিম্নরূপ:

  • দীর্ঘ প্রক্রিয়া: ওয়ার্ক পারমিট এবং ভিসা প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হতে পারে। তাই হাতে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে আবেদন করা উচিত।

  • সঠিক ডকুমেন্টেশন: সকল কাগজপত্র নির্ভুল ও সম্পূর্ণ রাখা জরুরি। সামান্য ভুলও আবেদন প্রক্রিয়ায় বিলম্ব ঘটাতে পারে।

  • সফটওয়্যার সিস্টেম: সরকার এখন বিদেশী নাগরিকদের তথ্যভান্ডার তৈরির জন্য একটি সফটওয়্যার সিস্টেম চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা ভবিষ্যতে প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করতে পারে। তবে এটি পুরোপুরি কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত প্রচলিত পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।

  • আইনি পরামর্শ: প্রয়োজনে একজন অভিজ্ঞ আইনি পরামর্শক বা কনসালটেন্টের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে, যারা এই ধরনের প্রক্রিয়ায় বিশেষজ্ঞ।

  • প্রতারণা থেকে সাবধান: কিছু অনিয়ম বা অবৈধভাবে কর্মী নিয়োগের অভিযোগও থাকে, তাই সর্বদা বৈধ এবং সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত।

  • স্পেশাল ব্রাঞ্চের নজরদারি: পুলিশ স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) বিদেশি কর্মীদের ভিসার শর্তভঙ্গ করছে কি না, তা দেখার জন্য মাঠে নামে।

এই তথ্যগুলো আপনার ক্লায়েন্টকে বাংলাদেশে বিদেশী কর্মী নিয়োগের বিষয়ে একটি স্পষ্ট ধারণা দিতে সাহায্য করবে। এটি তাদের বুঝতে সাহায্য করবে যে প্রক্রিয়াটি কিছুটা জটিল হলেও, সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে সফলভাবে বিদেশী কর্মী নিয়োগ করা সম্ভব।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কানাডা গমনেচ্ছুদের জন্য অত্যন্ত জরুরি: আপনার কি ATIP অ্যাকাউন্ট আছে? না থাকলে কেন আজই প্রয়োজন?

কানাডা গমনেচ্ছুদের জন্য অত্যন্ত জরুরি: আপনার কি ATIP অ্যাকাউন্ট আছে? না থাকলে কেন আজই প্রয়োজন? আপনি কি কানাডার ভিসার জন্য আবেদন করেছেন? অথবা...