বৃহস্পতিবার, ১০ জুলাই, ২০২৫

বাংলাদেশে ভিসার ধরন: অন অ্যারাইভাল নাকি স্টিকার ভিসা?

 বাংলাদেশে ভিসা প্রাপ্তির বিস্তারিত গাইড: অন অ্যারাইভাল ভিসা বনাম স্টিকার ভিসা

 বাংলাদেশে মূলত দুই ধরনের প্রধান ভিসা প্রচলিত আছে: ভিসা অন অ্যারাইভাল (Visa on Arrival - VoA) এবং স্টিকার ভিসা (Sticker Visa)। আপনার প্রশ্ন অনুযায়ী, উভয় ধরনের ভিসার পাশাপাশি স্টিকার ভিসা পাওয়ার বিস্তারিত প্রক্রিয়া নিচে তুলে ধরা হলো।


১. বাংলাদেশে ভিসার ধরন: অন অ্যারাইভাল নাকি স্টিকার ভিসা?

হ্যাঁ, বাংলাদেশে অন অ্যারাইভাল ভিসা (যেটি আপনি পূর্বে আলোচনা করেছেন) ছাড়াও স্টিকার ভিসা প্রচলিত আছে। বিদেশি নাগরিকদের বেশিরভাগই স্টিকার ভিসার মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন।

  • স্টিকার ভিসা (Regular/Sticker Visa): এটি হলো ঐতিহ্যবাহী ভিসা পদ্ধতি। এই ভিসা বিদেশি নাগরিকদের নিজ দেশের অবস্থিত বাংলাদেশী দূতাবাস, হাই কমিশন বা কনস্যুলেট থেকে আবেদন করে সংগ্রহ করতে হয়। ভিসা আবেদনকারীর পাসপোর্টে একটি ভিসার স্টিকার লাগানো হয়, যা তাকে বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি দেয়।

  • ভিসা অন অ্যারাইভাল (Visa on Arrival - VoA): এটি কিছু নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে বাংলাদেশের প্রবেশ পথে (বিমানবন্দর, স্থলবন্দর ইত্যাদি) সরাসরি ইস্যু করা হয়। এটি সকল দেশের নাগরিকের জন্য প্রযোজ্য নয় এবং এর মেয়াদ সীমিত।


২. একজন বিদেশী নাগরিক কিভাবে স্টিকার ভিসা পাবেন?

যদি কোনো বিদেশী নাগরিক অন অ্যারাইভাল ভিসার যোগ্য না হন অথবা দীর্ঘ মেয়াদের জন্য বা নির্দিষ্ট কোনো কাজের উদ্দেশ্যে (যেমন: কর্মসংস্থান, শিক্ষা) বাংলাদেশে আসতে চান, তাহলে তাকে অবশ্যই স্টিকার ভিসার জন্য আবেদন করতে হবে।

স্টিকার ভিসা পাওয়ার সাধারণ প্রক্রিয়া (ধাপে ধাপে):

ধাপ ১: ভিসা আবেদন ফরম সংগ্রহ ও পূরণ:

  • অনলাইন আবেদন: বর্তমানে, বাংলাদেশ সরকারের ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট (www.visa.gov.bd) থেকে ভিসার আবেদন ফরম অনলাইনে পূরণ করতে হয়। এটিই সবচেয়ে সাধারণ এবং প্রস্তাবিত পদ্ধতি।

  • সঠিক ক্যাটাগরি নির্বাচন: আবেদনকারীকে তার ভ্রমণের উদ্দেশ্য অনুযায়ী ভিসার সঠিক ক্যাটাগরি নির্বাচন করতে হবে (যেমন: ট্যুরিস্ট ভিসা - 'T', বিজনেস ভিসা - 'B', এমপ্লয়মেন্ট ভিসা - 'E', স্টুডেন্ট ভিসা - 'S', রিসার্চ ভিসা - 'R', ইত্যাদি)। প্রতিটি ক্যাটাগরির জন্য ভিন্ন প্রয়োজনীয়তা থাকে।

  • তথ্য পূরণ: আবেদন ফরমে পাসপোর্ট তথ্য, ব্যক্তিগত তথ্য, ভ্রমণ পরিকল্পনা, বাংলাদেশে যোগাযোগের ঠিকানা, পূর্বের ভিসা সংক্রান্ত তথ্য ইত্যাদি নির্ভুলভাবে পূরণ করতে হবে।

ধাপ ২: প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত:

ভিসা ক্যাটাগরি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ভিন্ন হয়, তবে কিছু সাধারণ এবং কিছু নির্দিষ্ট কাগজপত্র নিচে উল্লেখ করা হলো:

  • সাধারণ কাগজপত্র (সকল ভিসার জন্য প্রায় বাধ্যতামূলক):

    • বৈধ পাসপোর্ট: পাসপোর্টের মেয়াদ বাংলাদেশে প্রবেশের তারিখ থেকে কমপক্ষে ৬ মাস (কিছু ক্ষেত্রে ভিসা মেয়াদের পরও ৬ মাস) থাকতে হবে। পাসপোর্টের ডেটা পেজ-এর ফটোকপি।

    • পাসপোর্ট সাইজের ছবি: সাম্প্রতিক তোলা (সাধারণত ৬ মাসের বেশি পুরনো নয়), সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডের দুই কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি।

    • অনলাইন আবেদন ফরমের প্রিন্ট কপি: অনলাইনে পূরণকৃত ও স্বাক্ষরিত আবেদন ফরমের প্রিন্ট কপি।

    • ভিসা ফি রসিদ: ভিসার জন্য প্রযোজ্য ফি ব্যাংকে জমা দেওয়ার রসিদ।

    • রিটার্ন/অনওয়ার্ড টিকেট: বাংলাদেশে প্রবেশ এবং প্রস্থানের নিশ্চিত বিমান/ট্রেন/বাস টিকিটের কপি।

    • হোটেল রিজার্ভেশন: বাংলাদেশে থাকার জন্য হোটেল বুকিং-এর প্রমাণপত্র (পর্যটকদের জন্য)।

    • আর্থিক সামর্থ্যের প্রমাণ: ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশে থাকার জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক সামর্থ্যের প্রমাণ।

    • উদ্দেশ্য বিবরণ: বাংলাদেশে ভ্রমণের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে একটি কভার লেটার (ব্যক্তিগত বা অফিসিয়াল লেটারহেডে)।

  • নির্দিষ্ট ভিসার জন্য অতিরিক্ত কাগজপত্র (উদাহরণ):

    • ট্যুরিস্ট ভিসা (T):

      • বাংলাদেশে কোনো ব্যক্তি কর্তৃক আমন্ত্রণপত্র (যদি থাকে) এবং আমন্ত্রণকারীর আইডি প্রুফ।

      • পূর্ববর্তী ভ্রমণ ইতিহাস (যদি থাকে)।

    • বিজনেস ভিসা (B):

      • আবেদনকারীর নিজ কোম্পানি থেকে ফরওয়ার্ডিং লেটার।

      • বাংলাদেশের কোনো নিবন্ধিত কোম্পানি/সংস্থা থেকে আমন্ত্রণপত্র।

      • আমন্ত্রণকারী কোম্পানির ট্রেড লাইসেন্স ও অন্যান্য নিবন্ধন।

    • এমপ্লয়মেন্ট ভিসা (E):

      • নিয়োগকারী বাংলাদেশী কোম্পানি থেকে নিয়োগপত্র।

      • সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ (যেমন BIDA) থেকে ওয়ার্ক পারমিটের সুপারিশপত্র/অনুমোদনপত্র।

      • আবেদনকারীর শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার সনদপত্র।

      • পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট (নিজ দেশ থেকে)।

    • স্টুডেন্ট ভিসা (S):

      • বাংলাদেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ভর্তির নিশ্চিতকরণ পত্র।

      • শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্র।

      • আর্থিক সামর্থ্যের প্রমাণ (নিজস্ব বা স্পনসরের)।

    • অন্যান্য ভিসা (যেমন সাংবাদিক, গবেষক, এনজিও কর্মী): এই ভিসাগুলোর জন্য সংশ্লিষ্ট পেশাদারী সনদ, প্রতিষ্ঠান থেকে চিঠি, বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ইত্যাদি প্রয়োজন হতে পারে।

ধাপ ৩: ভিসা ফি পরিশোধ:

  • ভিসা ফি প্রতিটি দেশের জন্য এবং ভিসার ধরনের জন্য ভিন্ন হয়। এই ফি সাধারণত যে দেশে আপনি আবেদন করছেন, সেখানকার বাংলাদেশী দূতাবাসের নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট ব্যাংকে নগদ বা ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হয়। ফি ফেরতযোগ্য নয়।

ধাপ ৪: দূতাবাসে আবেদনপত্র জমা দান:

  • পূরণকৃত অনলাইন আবেদন ফরমের প্রিন্ট কপি, ছবি এবং সমস্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সহ আবেদনকারীকে তার নিজ দেশে অবস্থিত বাংলাদেশী দূতাবাস, হাই কমিশন বা কনস্যুলেটে সরাসরি বা তাদের নির্ধারিত ভিসা আবেদন কেন্দ্রের মাধ্যমে আবেদনপত্র জমা দিতে হবে।

  • কিছু দূতাবাস/কনস্যুলেট অ্যাপয়েন্টমেন্টের মাধ্যমে আবেদনপত্র গ্রহণ করে। তাই আগে থেকে তাদের ওয়েবসাইটে নিয়মাবলী দেখে নেওয়া উচিত।

ধাপ ৫: ভিসা প্রক্রিয়াকরণ ও সংগ্রহ:

  • দূতাবাস আবেদনপত্র ও কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করবে। প্রয়োজনে আবেদনকারীকে সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকা হতে পারে।

  • নিরাপত্তা ছাড়পত্র এবং অন্যান্য অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর, ভিসা অনুমোদিত হলে আবেদনকারীর পাসপোর্টে ভিসার স্টিকার লাগানো হয়।

  • দূতাবাসের নির্দেশ অনুযায়ী নির্দিষ্ট তারিখে পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে হবে।


৩. কোন কোন দেশ থেকে স্টিকার ভিসার জন্য আবেদন করা যাবে?

একজন বিদেশী নাগরিককে তার নিজস্ব দেশ (যে দেশের নাগরিক) অথবা যে দেশে তিনি বৈধভাবে বসবাস করছেন (রেসিডেন্ট পারমিট সহ), সেখানকার বাংলাদেশী দূতাবাস, হাই কমিশন বা কনস্যুলেটে ভিসার জন্য আবেদন করতে হবে।

উদাহরণস্বরূপ:

  • যদি একজন জাপানি নাগরিক বাংলাদেশে আসতে চান, তাহলে তিনি জাপানের টোকিওতে অবস্থিত বাংলাদেশী দূতাবাস থেকে ভিসার জন্য আবেদন করবেন।

  • যদি একজন ভারতীয় নাগরিক জার্মানিতে বৈধভাবে বসবাস করেন, তবে তিনি জার্মানির বার্লিনে অবস্থিত বাংলাদেশী দূতাবাস থেকে ভিসার জন্য আবেদন করতে পারবেন (যদিও সাধারণত নিজ দেশ থেকেই আবেদন করার নিয়ম)।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: যেসব দেশে বাংলাদেশের কোনো দূতাবাস নেই, সেখানকার নাগরিকরা সাধারণত অন অ্যারাইভাল ভিসার জন্য যোগ্য হন। তবে যদি তারা দীর্ঘ মেয়াদের জন্য আসতে চান এবং অন অ্যারাইভাল ভিসার শর্ত পূরণ না করেন, তাহলে তাদের নিকটতম দেশে অবস্থিত বাংলাদেশী দূতাবাস থেকে আবেদন করতে হতে পারে।


৪. গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ আপনার ওয়েবসাইটের ভিজিটরদের জন্য:

  • সঠিক তথ্যের উৎস: সর্বদা বাংলাদেশ সরকারের ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট (www.visa.gov.bd) এবং আবেদনকারীর নিজ দেশের বাংলাদেশী দূতাবাস/হাই কমিশন/কনস্যুলেটের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে সর্বশেষ ভিসা তথ্য ও নির্দেশাবলী যাচাই করতে উৎসাহিত করুন। ভিসার নিয়মাবলী যেকোনো সময় পরিবর্তিত হতে পারে।

  • আগেই আবেদন: পর্যাপ্ত সময় হাতে রেখে ভিসার জন্য আবেদন করার পরামর্শ দিন, কারণ প্রক্রিয়াকরণে অপ্রত্যাশিত বিলম্ব হতে পারে।

  • ডকুমেন্টেশন: সকল প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নির্ভুলভাবে প্রস্তুত করুন। ছোটখাটো ভুলও ভিসা প্রত্যাখ্যান বা প্রক্রিয়ায় বিলম্ব ঘটাতে পারে।

  • উদ্দেশ্য স্পষ্ট রাখুন: ভ্রমণের উদ্দেশ্য ভিসা কর্মকর্তার কাছে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করুন।

এই বিস্তারিত গাইডটি বাংলাদেশে ভিসা প্রাপ্তির প্রক্রিয়াটি বুঝতে এবং তাদের আবেদন সফলভাবে সম্পন্ন করতে সহায়ক হবে বলে আশা করি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কানাডা গমনেচ্ছুদের জন্য অত্যন্ত জরুরি: আপনার কি ATIP অ্যাকাউন্ট আছে? না থাকলে কেন আজই প্রয়োজন?

কানাডা গমনেচ্ছুদের জন্য অত্যন্ত জরুরি: আপনার কি ATIP অ্যাকাউন্ট আছে? না থাকলে কেন আজই প্রয়োজন? আপনি কি কানাডার ভিসার জন্য আবেদন করেছেন? অথবা...