মঙ্গলবার, ১ জুলাই, ২০২৫

কিউবার পর্যটন বা ভ্রমণ ভিসা সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন

বাংলাদেশের পর্যটকদের জন্য বিস্তারিত নির্দেশিকা

কিউবা, ক্যারিবীয় সাগরের বৃহত্তম দ্বীপ রাষ্ট্র, তার সমৃদ্ধ ইতিহাস, প্রাণবন্ত সংস্কৃতি, বিপ্লবী ঐতিহ্য এবং অত্যাশ্চর্য সৈকতের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। হাভানার (Havana) রঙিন ঔপনিবেশিক স্থাপত্য, ত্রিনিদাদের (Trinidad) ঐতিহাসিক cobblestone রাস্তা, ভারাদেরো (Varadero)-এর সাদা বালির সৈকত এবং কিউবান সিগার ও সালসা নাচের ঐতিহ্য পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ। এটি সেইসব ভ্রমণকারীদের জন্য আদর্শ যারা একটি ভিন্নধর্মী এবং সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা খুঁজছেন।

বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য কিউবা ভ্রমণের জন্য আগে থেকে ভিসা (Pre-arranged Visa) প্রয়োজন। কিউবার ক্ষেত্রে, পর্যটন ভিসা মূলত একটি "ট্যুরিস্ট কার্ড" (Tourist Card / Tarjeta del Turista) আকারে ইস্যু করা হয়।

১. ভিসার ক্যাটাগরি (বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য):

কিউবার ভিসা মূলত উদ্দেশ্য অনুসারে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বিভক্ত। পর্যটন/ভ্রমণ সম্পর্কিত প্রধান ক্যাটাগরিগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

  • ট্যুরিস্ট কার্ড / ট্যুরিস্ট ভিসা (Tourist Card / Tarjeta del Turista):

    • উদ্দেশ্য: দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন, ব্যক্তিগত ছুটি কাটানো, বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়-স্বজনের সাথে দেখা করা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া, বা অন্যান্য বিনোদনমূলক কার্যক্রমে অংশ নেওয়া।

    • মেয়াদ: ট্যুরিস্ট কার্ড সাধারণত ৩০ দিনের জন্য বৈধ থাকে এবং একবার ৩০ দিনের জন্য নবায়ন করা যায়, যা কিউবার অভ্যন্তরে করা যেতে পারে। এটি সিঙ্গেল এন্ট্রি ভিসা।

    • বিশেষ বিবেচনা: ট্যুরিস্ট কার্ড শুধুমাত্র পর্যটন উদ্দেশ্যের জন্য। এটি কিউবায় কাজ করা বা দীর্ঘমেয়াদী পড়াশোনা করার অনুমতি দেয় না।

  • অন্যান্য ভিসা: ব্যবসায়িক ভিসা, পারিবারিক ভিসা, সাংবাদিক ভিসা ইত্যাদি বিভিন্ন ক্যাটাগরির ভিসা রয়েছে, যা ট্যুরিস্ট কার্ডের থেকে ভিন্ন প্রক্রিয়া এবং নথিপত্রের প্রয়োজন হয়।

২. আবেদন প্রক্রিয়া (বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে):

বাংলাদেশে কিউবার কোনো দূতাবাস বা কনস্যুলেট নেই। বাংলাদেশের নাগরিকদের ভিসার জন্য সাধারণত ভারতের নয়াদিল্লিতে অবস্থিত কিউবার দূতাবাস থেকে আবেদন করতে হয়। ট্যুরিস্ট কার্ড বিভিন্নভাবে সংগ্রহ করা যেতে পারে:

ক. নয়াদিল্লিতে কিউবান দূতাবাস থেকে সরাসরি আবেদন:

  • ধাপ ১: দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ:

    • ভারতের নয়াদিল্লিতে অবস্থিত কিউবার দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করে ট্যুরিস্ট কার্ড প্রাপ্তির সর্বশেষ নিয়মাবলী, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং ফি সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে নিন।

  • ধাপ ২: আবেদন ফরম সংগ্রহ ও পূরণ:

    • দূতাবাস থেকে ট্যুরিস্ট কার্ডের আবেদন ফরম সংগ্রহ করুন (যদি অনলাইনে উপলব্ধ না থাকে) এবং নির্ভুলভাবে পূরণ করুন।

  • ধাপ ৩: প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত:

    • উল্লেখিত সকল প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত রাখুন। (বিস্তারিত নিচে দেখুন)

  • ধাপ ৪: ভিসা ফি পরিশোধ:

    • ট্যুরিস্ট কার্ডের ফি সাধারণত $২০ - $৫০ মার্কিন ডলারের মধ্যে হতে পারে। ফি পরিশোধের পদ্ধতি (ব্যাংক ট্রান্সফার, ক্যাশ) দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া উচিত। ভিসা আবেদন বাতিল হলে ফি সাধারণত ফেরতযোগ্য নয়।

  • ধাপ ৫: আবেদন জমা দেওয়া:

    • সশরীরে অথবা অনুমোদিত প্রতিনিধির মাধ্যমে আবেদনপত্র ও সকল নথি নয়াদিল্লি দূতাবাসে জমা দিন। দূতাবাস সাধারণত কুরিয়ার বা ডাকযোগে নথি গ্রহণ করে না, তাই এই বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া জরুরি।

  • ধাপ ৬: ট্যুরিস্ট কার্ড সংগ্রহ:

    • প্রক্রিয়াকরণ সম্পন্ন হলে আপনাকে ট্যুরিস্ট কার্ড সংগ্রহের জন্য অবহিত করা হবে। এটি সাধারণত একটি পৃথক কার্ড আকারে প্রদান করা হয়, যা পাসপোর্টে স্ট্যাম্প করা হয় না। এটি ভ্রমণের সময় পাসপোর্টের সাথে রাখতে হয়।

    প্রক্রিয়াকরণের সময়: ট্যুরিস্ট কার্ড পেতে সাধারণত ৫-১৫ কার্যদিবস সময় লাগতে পারে, তবে এটি দূতাবাসের কাজের চাপের উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে।

খ. অনুমোদিত এয়ারলাইন্স বা ট্র্যাভেল এজেন্টের মাধ্যমে:

অনেক সময়, নির্দিষ্ট কিছু এয়ারলাইন্স যারা কিউবাতে ফ্লাইট পরিচালনা করে, অথবা কিছু আন্তর্জাতিক ট্র্যাভেল এজেন্সি তাদের যাত্রীদের জন্য ট্যুরিস্ট কার্ড ইস্যু করার ক্ষমতা রাখে। বাংলাদেশের নাগরিকরা যদি সরাসরি কিউবাগামী ফ্লাইট বুক করেন, তাহলে এয়ারলাইন্সকে জিজ্ঞাসা করতে পারেন তারা ট্যুরিস্ট কার্ড সরবরাহ করে কিনা। এটি প্রক্রিয়াটিকে সহজ করতে পারে।

  • ধাপ ১: এয়ারলাইন্স/এজেন্টের সাথে যোগাযোগ:

    • আপনার নির্বাচিত এয়ারলাইন্স বা ট্র্যাভেল এজেন্টের সাথে যোগাযোগ করে তাদের ট্যুরিস্ট কার্ড পরিষেবা সম্পর্কে জেনে নিন।

  • ধাপ ২: প্রয়োজনীয় নথি জমা ও ফি পরিশোধ:

    • এয়ারলাইন্স বা এজেন্টের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নথি এবং ফি জমা দিন।

  • ধাপ ৩: ট্যুরিস্ট কার্ড সংগ্রহ:

    • এয়ারলাইন্স বা এজেন্ট আপনাকে ট্যুরিস্ট কার্ড ইস্যু করে দেবে।

৩. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র (বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য ট্যুরিস্ট কার্ডের সাধারণ তালিকা):

কিউবার ট্যুরিস্ট কার্ডের জন্য আবেদন করতে নিম্নলিখিত নথিগুলি সাধারণত প্রয়োজন হয়:

  • বৈধ পাসপোর্ট:

    • মূল পাসপোর্ট, যার মেয়াদ কিউবা থেকে আপনার প্রস্তাবিত প্রস্থান তারিখের পরেও কমপক্ষে ৬ মাস থাকতে হবে।

    • পাসপোর্টের বায়ো-ডেটা পৃষ্ঠার (ব্যক্তিগত তথ্য সম্বলিত পৃষ্ঠা) ফটোকপি।

  • পূরণকৃত ট্যুরিস্ট কার্ড আবেদন ফরম:

    • যথযথভাবে পূরণ করা ও স্বাক্ষর করা ফরম।

  • পাসপোর্ট আকারের ছবি:

    • সাম্প্রতিক (৬ মাসের বেশি পুরনো নয়) ১-২ কপি পাসপোর্ট আকারের রঙিন ছবি (সাদা বা হালকা ব্যাকগ্রাউন্ডে, উচ্চ রেজোলিউশন)।

  • ফেরত বা পরবর্তী ভ্রমণের টিকিট:

    • কিউবা থেকে নিশ্চিত ফেরত টিকিট বা পরবর্তী গন্তব্যের টিকিট। এটি প্রমাণ করে যে আপনি একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য যাচ্ছেন এবং ফিরে আসবেন।

  • আবাসনের প্রমাণ:

    • হোটেল রিজার্ভেশনের নিশ্চিতকরণ (পুরো থাকার সময়কালের জন্য) অথবা যেখানে থাকবেন তার বিস্তারিত ঠিকানা।

    • যদি কোনো ব্যক্তি আপনাকে আমন্ত্রণ জানান, তবে সেই ব্যক্তির দ্বারা স্বাক্ষরিত একটি আমন্ত্রণপত্র এবং তার পরিচয়ের প্রমাণ (কিউবান আইডি বা রেসিডেন্ট পারমিট)।

  • আর্থিক সচ্ছলতার প্রমাণ:

    • ব্যাংক স্টেটমেন্ট (যাতে কিউবায় আপনার থাকা ও ভ্রমণের খরচ বহন করার সক্ষমতা প্রমাণ করে)। কিছু ক্ষেত্রে ক্রেডিট কার্ড বা ট্রাভেলার্স চেক দেখাতে হতে পারে।

  • ভ্রমণ বীমা:

    • কভারেজ সহ আন্তর্জাতিক ভ্রমণ চিকিৎসা বীমা, যা কিউবায় আপনার থাকার পুরো সময়কালের জন্য বৈধ থাকতে হবে। কিউবার কর্তৃপক্ষ বিদেশী ভ্রমণকারীদের জন্য ভ্রমণ বীমা বাধ্যতামূলক করেছে।

নথি সংক্রান্ত টিপস: সকল নথি ইংরেজিতে বা স্প্যানিশ ভাষায় থাকলে ভালো। সকল ফটোকপির মান ভালো হতে হবে।

৪. আবেদনের স্থান (বাংলাদেশে দূতাবাস):

বর্তমানে বাংলাদেশে কিউবার কোনো নিজস্ব দূতাবাস বা কনস্যুলেট নেই।

৫. পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে আবেদন:

যেহেতু বাংলাদেশে কিউবার কোনো দূতাবাস নেই, বাংলাদেশের নাগরিকদের ভিসার জন্য ভারতের নয়াদিল্লিতে অবস্থিত কিউবার দূতাবাস থেকে আবেদন করতে হয়।

  • কিউবার দূতাবাস, নয়াদিল্লি, ভারত (Embassy of Cuba in New Delhi, India):

    • ঠিকানা: B 50, Vasant Marg, Vasant Vihar, New Delhi - 110057, India.

    • ফোন: +91 11 2614 2603 / 2614 2275

    • ই-মেইল (সাধারণত): embacuba@airtelmail.in / embacubaindia@gmail.com (যোগাযোগ করে নিশ্চিত হওয়া আবশ্যক)।

    • ওয়েবসাইট: https://misiones.cubaminrex.cu/es/india/embajada-de-cuba-en-india (স্প্যানিশে, ইংরেজিতে রূপান্তরের অপশন থাকতে পারে)।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: নয়াদিল্লি দূতাবাস থেকে আবেদন করার আগে, সরাসরি তাদের সাথে ফোন বা ইমেইলের মাধ্যমে যোগাযোগ করে তাদের বর্তমান নিয়মাবলী, আবেদন প্রক্রিয়া এবং বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য ট্যুরিস্ট কার্ড প্রক্রিয়াকরণের বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া উচিত। সশরীরে উপস্থিত থাকা বা অনুমোদিত প্রতিনিধির মাধ্যমে নথি জমা দেওয়া প্রয়োজন হতে পারে, তাই ভ্রমণের পরিকল্পনা করার সময় এই বিষয়টি মাথায় রাখা উচিত।

৬. ই-ভিসা (e-Visa):

বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, কিউবা বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য কোনো ই-ভিসা (e-Visa) ব্যবস্থা চালু করেনি যা দিয়ে তারা পূর্বেই অনলাইনে ভিসা পেয়ে সরাসরি প্রবেশ করতে পারেন। কিউবার জন্য প্রধানত ট্যুরিস্ট কার্ড ব্যবহার করা হয়, যা দূতাবাস, অনুমোদিত এয়ারলাইন্স বা ট্র্যাভেল এজেন্টদের মাধ্যমে সংগ্রহ করতে হয়। এটি একটি ভৌত কার্ড যা ভ্রমণের সময় সাথে রাখতে হয়।

গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা: যেকোনো অননুমোদিত ওয়েবসাইট বা এজেন্ট যারা বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য সরাসরি ই-ভিসা বা সহজ প্রক্রিয়ার প্রস্তাব দেয়, তাদের থেকে সতর্ক থাকুন। সবসময় কিউবার নয়াদিল্লি দূতাবাস বা তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের উপর নির্ভর করুন। ভ্রমণের আগে সর্বশেষ ভিসা নীতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ:

সম্মানিত পাঠকের প্রতি অনুরোধ রইল, ভিসা আবেদন করার সময় কিউবার নয়াদিল্লি দূতাবাস বা সংশ্লিষ্ট দেশের সুনির্দিষ্ট ওয়েবসাইট দেখে আবেদন করবেন, কারণ প্রতিনিয়ত বিভিন্ন দেশ তাদের ভিসা নীতি, ভিসার ক্যাটাগরি, মেয়াদ এবং শর্ত পরিবর্তন করে। সর্বশেষ এবং সঠিক তথ্যের জন্য সবসময় অফিসিয়াল উৎস ব্যবহার করুন এবং যেকোনো প্রকার দালালের প্রলোভনে না পড়ে নিজের আবেদন নিজে পূরণ করার চেষ্টা করুন অথবা বিশ্বস্ত এবং নিবন্ধিত ভিসা কনসালটেন্সি সংস্থার সাহায্য নিন।


GRAMEEN TOURS & Travels Whatsapp: 01336-556033 Email: grameentour@gmail.com

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কানাডা গমনেচ্ছুদের জন্য অত্যন্ত জরুরি: আপনার কি ATIP অ্যাকাউন্ট আছে? না থাকলে কেন আজই প্রয়োজন?

কানাডা গমনেচ্ছুদের জন্য অত্যন্ত জরুরি: আপনার কি ATIP অ্যাকাউন্ট আছে? না থাকলে কেন আজই প্রয়োজন? আপনি কি কানাডার ভিসার জন্য আবেদন করেছেন? অথবা...