বিশ্বের ক্ষুদ্রতম দশটি দেশ
ছোটবেলায় বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশকে খুঁজে পেতে গলদঘর্ম অবস্থা হয়নি, এমন মানুষ পাওয়া মুশকিল। প্রিয় জন্মভূমির ক্ষুদ্র আকৃতি দেখে মুখ ফুটে বেরিয়ে আসত আফসোসের দীর্ঘশ্বাস। এখনও দেশের আয়তন আর জনসংখ্যা পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তা করেন প্রতিটি সচেতন নাগরিক। কিন্তু জানেন কি, বাংলাদেশের চেয়েও আয়তনে ছোট বহু দেশ আছে। এমনকি কোনো কোনো দেশের আয়তন আমাদের প্রিয় ঢাকা নগরীর চেয়েও ক্ষুদ্র। যাহোক, কথা না বাড়িয়ে পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম দশটি দেশ এর বর্ণনা শুরু করা যাক।
১০. মাল্টা (৩১৬ বর্গকিলোমিটার)
মেডিটেরিয়ান সাগরের বুকে অবস্থিত মাল্টা সাতটি দ্বীপপুঞ্জের সমন্বয়ে গঠিত। দেশটির আয়তন রাজধানী ঢাকার চেয়ে মাত্র ১০ বর্গকিলোমিটার বড়। জনসংখ্যা প্রায় ৪,৪৬,৫৪৭ জন। তাই জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় প্রথম সারির দেশও এটি। বিভিন্ন সময়কালে মাল্টায় রাজত্ব করেছে ফিনিশিয়, রোমান, সিসিলিয়ান, ফরাসি ও ব্রিটিশ।১৯৬৪ সালে স্বাধীনতা লাভ করে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে। বর্তমানে আয়ের প্রধান উৎস পর্যটন খাত। প্রাগৈতিহাসিক স্থাপনা ও মনোমুগ্ধকর সৈকতের টানে প্রতি বছর প্রায় ১ মিলিয়ন পর্যটক ছুটে আসে এখানে।
৯. মালদ্বীপ ( ২৯৮ বর্গকিলোমিটার)
ভারত মহাসাগরে অবস্থিত এশিয়ার ক্ষুদ্রতম দেশ মালদ্বীপ। পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম দশটি দেশ এর মধ্যে মালদ্বীপ আছে ৯ নাম্বাবের। প্রায় ১০৯০ টি দ্বীপের সমষ্টি এ দেশটি। খ্রীস্টপূর্ব ৫ম শতক থেকে মানববসতি রয়েছে এখানে। একসময়ে দেশটি পর্তুগিজ, ডাচ ও ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল৷ ১৯৬৫ সালে মালদ্বীপ একটি স্বাধীন দেশরূপে আত্মপ্রকাশ করে। মালদ্বীপের রাষ্ট্রীয় আয়ের সিংহভাগ আসে পর্যটন খাত থেকে। এখানকার ঝকঝকে সাদা সমুদ্রসৈকত, প্রবাল প্রাচীর, সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য, এবং স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ জল পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ। কিন্তু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এ দেশটির অস্তিত্ব বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে হুমকির সম্মুখীন। কারণ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মালদ্বীপের উচ্চতা মাত্র ১.৫ মিটার।
৮. সেন্ট কিটস এন্ড নেভিস (২৬১ বর্গকিলোমিটার)
ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের ছোট্ট দুটি দ্বীপ নিয়ে গঠিত উত্তর আমেরিকার ক্ষুদ্রতম দেশ সেন্ট কিটস এন্ড নেভিস। দেশটি সর্বপ্রথম আবিষ্কৃত হয় ক্রিস্টোফার কলম্বাসের হাতে। এখানে উপনিবেশ স্থাপনের লড়াইয়ে ফ্রান্স ও ব্রিটিশদের মাঝে এক শতকব্যাপী যুদ্ধ চলে। অবশেষে ১৭১৩ সালে পরিপূর্ণ ব্রিটিশ কলোনিতে পরিণত হয়। স্বাধীনতা লাভ করে ১৯৮৩ সালে। সেন্ট কিটস ও নেভিস দ্বীপের আয়তন যথাক্রমে ১৬৮ ও ৯৩ বর্গকিলোমিটার। এখানকার সমুদ্রসৈকত, সবুজ উপত্যকা এবং রেইন ফরেস্ট বেশ উপভোগ্য ও আকর্ষণীয়। এই দ্বীপ রাষ্ট্রটির অর্থনীতি পর্যটন ও চিনি উৎপাদনের উপর নির্ভরশীল।
৭. মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ ( ১৮১ বর্গকিলোমিটার)
মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ প্রবাল প্রাচীরের মাধ্যমে সংযুক্ত অসংখ্য দ্বীপ এবং উপদ্বীপের সমষ্টি। তন্মধ্যে জনবসতি আছে, এমন ২৪ টি দ্বীপে বাস করে প্রায় ৬৮ হাজার মানুষ। ১৯৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ফ্রি কমপ্যাক্ট অ্যাসোসিয়েশনের অধীনে স্বাধীনতা লাভ করে। এই দ্বীপপুঞ্জের অর্থনীতি হস্তশিল্প, নারিকেল, মৎস্যশিল্প, পর্যটন এবং বিশেষত বৈদেশিক সাহায্যের উপর নির্ভরশীল। এখানকার স্বচ্ছ নীল পানিতে পাওয়া যায় ১৬০ প্রজাতির প্রবাল ও ৮০০ প্রজাতির মাছ। এছাড়াও স্কুভা ডাইভিং ও স্নরকেলিংয়ের জন্যও উপযুক্ত গন্তব্য।
৬. লিশটেনস্টাইন (১৬০ বর্গকিলোমিটার)
আল্পস পর্বতমালার কোলে অবস্থিত লিশটেনস্টাইন ইউরোপের চতুর্থ ক্ষুদ্রতম দেশ। এর পশ্চিম ও দক্ষিণ দিক দিয়ে সুইজারল্যান্ড এবং উত্তর ও পূর্বদিক দিয়ে অস্ট্রিয়া আবৃত করে রেখেছে। মাথাপিছু GDPর বিবেচনায় লিশটেনস্টাইন পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশ৷ চারপাশে ভূমিবেষ্টিত দেশটি একজন প্রিন্স কতৃক শাসিত। তবে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতে তিনজন মন্ত্রী, একজন উপ-প্রধানমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর সমন্বয়ে সরকার গঠিত হয়। লিশটেনস্টাইনের রাষ্ট্রভাষা জার্মান। ধাতু প্রস্তুতকর, সিরামিক, ডেন্টাল ও ইলেকট্রনিক পণ্যসামগ্রী উৎপাদন দেশটির প্রধান শিল্প।
৫. স্যান মেরিনো (৬১ বর্গকিলোমিটার)
ইতালির বুকের মাঝে ছোট্ট একটি বিন্দু স্যান মেরিনো। এটি ইউরোপের সবচেয়ে পুরোনো গণতান্ত্রিক দেশ, যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ৩০১ খ্রীস্টপূর্বে । রাজধানীর নামও স্যান মেরিনো। মাথাপিছু GDPর দিক থেকে পৃথিবীর অন্যতম ধনী রাষ্ট্রগুলোর একটি এটি। এখানে মানুষের চেয়ে যানবাহনসংখ্যা বেশী। এদেশের অর্থনীতি মূলত পর্যটন, ব্যাংকিং ও টেক্সটাইলের নির্ভরশীল। বিশ্বের ক্ষুদ্রতম দশটি দেশ এর মধ্যে নাউরু আছে ৫ নাম্বারে।
৪. টুভ্যালু ( ২৬ বর্গকিলোমিটার)
পূর্বে এলিস আইল্যান্ড নামে পরিচিত টুভ্যালু অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণে প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত। এটি পাঁঁচটি প্রবাল ও চারটি দ্বীপের সমন্বয়ে গড়া। রাজধানীর নাম ফুনাফুতি। শহরটি এর মধ্যে অবস্থিত ১৮ কি মি দৈর্ঘ্য ও ১৪ কি মি প্রশস্ত লাগুনের জন্য বিখ্যাত। খ্রীস্টপূর্ব ১৯৭৬ অব্দে পলেশিয়ানরা সর্বপ্রথম টুভ্যালুতে বসতি স্থাপন করে। ১৯৭৬ সালে ব্রিটিশ এদেশ দখলে নেয়। ১৯৭৮ সালে টুভ্যালু স্বাধীনতা লাভ করে।
৩. নাউরু (২১ বর্গকিলোমিটার)
পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম দ্বীপরাষ্ট্র নাউরু। জনসংখ্যা বিবেচনায়ও দ্বিতীয় অবস্থানে এ দেশটি। এই দ্বীপে মাত্র ৯৩৭৮ জন মানুষের বাস। দেশটি ফসফেট পাথরে সমৃদ্ধ। ১৯৬০-৭০ এর দশকে ফসফেট উত্তোলনই ছিল অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি। বর্তমানে এছাড়াও নারিকেলজাত পণ্য ও অফশোর ব্যাংকিং নাউরুর আয়ের প্রধান উৎস।
২. মোনাকো ( ২ বর্গকিলোমিটার)
ফ্রান্সের দক্ষিণ- পূর্বে ভূ-মধ্যসাগরের কোল ঘেঁষে অবস্থিত ধনীদের দেশ মোনাকো। পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশের তালিকাও এর অবস্থান প্রথম। গ্রিমালডি পরিবারের সদস্যারা এই নগর রাষ্ট্রটি শাসন করে থাকে। মন্তে কারলো ক্যাসিনোর জন্য মোনাকো বিশ্বব্যাপী খ্যাত। এখানে ভীড় জমায় পৃথিবীর বাঘা বাঘা সব ধনকুবেররা। দেশটির অর্থনীতির মূল উৎসও এটি। Monaco Grand Pix নামে আয়োজিত ফরমুলা ওয়ান রেসিংও মোনাকোর অন্যতম আকর্ষণ।
১. ভ্যাটিকান সিটি (.৪৪ বর্গকিলোমিটার)
পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম দশটি দেশ এর মধ্যে সবচেয়ে ছোট দেশটি হলো ইতালির রাজধানী রোমের ভেতর অবস্থিত ভ্যাটিকান সিটি। এটি The Holy See নামেও পরিচিত। সারা বিশ্বের ক্যাথলিক চার্চগুলোর প্রাণকেন্দ্র এই ভ্যাটিকান। এখানেই বাস করে খ্রিস্টানদের সবচেয়ে বড় ধর্মগুরু পোপ। তিনিই দেশটির শাসনকার্য পরিচালনা করেন। সবচেয়ে কম জনসংখ্যার দেশও এই ভ্যাটিকান সিটি।
শুধুমাত্র পোপ কর্তৃক অনুমোদিত ব্যক্তিরাই বাস করতে পারে এখানে। ভ্যাটিকান সিটিতে রয়েছে হাজার বছরের পুরোনো বিভিন্ন গোপন দলিল দস্তাবেজ ও ঐতিহাসিক স্থাপনা। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য সেন্ট পিটার ব্যাসিলিকা, ভ্যাটিকান মিউজিয়াম ও সিস্টিন চ্যাপেল। প্রতিবছর প্রায় চার মিলিয়ন পর্যটক ছুটে আসে খ্রিস্টানদের এই পবিত্র ভূমিতে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন