রবিবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০২১

পৃথিবীর দারিদ্র্য দশটি দেশের অর্থনীতি

 পৃথিবীর দারিদ্র্য দশটি দেশের অর্থনীতি

উন্নত দেশগুলোর অর্থনীতিকে বিশ্লেষণ করলে একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যাবে। সেটি হলো আইনের শাসন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনব্যবস্থা ও শক্তিশালী বিচার ব্যবস্থার সমন্বয়ে গঠিত একটি সুষ্ঠ রাজনৈতিক পরিবেশ। অপরদিকে দরিদ্র দেশগুলোর পক্ষে অর্থনৈতিক ভারসাম্যের মৌলিক প্রভাবক এ সমস্যাগুলো খুঁজে বের করা দুষ্কর। প্রাকৃতিক সম্পদের মজুদ যেমন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী একটা দেশের মূলভিত্তি, তেমনভাবে সেই সম্পদের যথাযথ ব্যবহারও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। যাইহোক, এটা যেহেতু অর্থনীতির প্রাথমিক ক্লাস নয়, তাই আমরা সরাসরি মূল পয়েন্টে চলে যাচ্ছি। এখানে সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণসহ ২০১৮ সালের সর্বোচ্চ দারিদ্র্য সীমার নিচে দশটি দেশের অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা করা হলো।

১০.মাদাগাস্কার (মাথাপিছু আয়: ১৪৭৭ মার্কিন ডলার)

৯.গিনি (মাথাপিছু আয়: ১৩৮৮ মার্কিন ডলার)

৮.ইরিত্রিয়া (মাথাপিছু আয়: ১২১০ মার্কিন ডলার)

৭.মোজাম্বিক (মাথাপিছু আয়: ১২০৮ মার্কিন ডলার)

৬.নাইজার ( মাথাপিছু আয়: ১০৬৯ মার্কিন ডলার)

৫.বুরুন্ডি (মাথাপিছু আয়: ৯৫১ মার্কিন ডলার)

৪.লাইবেরিয়া ( মাথাপিছু আয়: ৯৩৪ মার্কিন ডলার)

৩.মালাউ ( মাথাপিছু আয়: ৮১৯ মার্কিন ডলার)

২.গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র ( মাথাপিছু আয়: ৭৫৩ মার্কিন ডলার)

১.মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র ( মাথাপিছু আয়: ৬৩৬ মার্কিন ডলার)

মাদাগাস্কার (মাথাপিছু আয়: ১৪৭৭ মার্কিন ডলার) : মাদাগাস্কারের অর্থনীতি বহুলাংশে কৃষির উপর নির্ভরশীল। কৃষির ব্যবসায়িক প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করে কৃষির মূলভিত্তিকে টিকিয়ে রাখার জন্য মাদাগাস্কার অপেক্ষাকৃত ভাল সাফল্য লাভ করেছে। কিন্তু বহু বছর ধরে ত্রুটিপূর্ণ অর্থনৈতিক সংস্কার আর রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশটির অর্থনীতিতে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে। অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের অসম উন্নয়ন প্রবৃদ্ধিকে ব্যহত করছে। ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্যতা আর দূর্নীতির কারণে প্রাইভেট সেক্টর মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারছে না।

গিনি (মাথাপিছু আয়: ১৩৮৮ মার্কিন ডলার) : স্বাধীনতার পর থেকে গিনি খুব অল্পই উন্নতি করতে পেরেছে। ক্রুটিপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এর জন্য দায়ী। প্রশাসনিক সংস্থাগুলোর দুর্বলতার কারণে আশাপ্রদ প্রাইভেট সেক্টরের অবস্থাও নিশ্চল। উপরন্তু বিচার ব্যবস্থা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ আর দুর্নীতির কাছে অসহায়। গিনি ব্রক্সাইট, লোহা, স্বর্ণ, ডায়মন্ড প্রভৃতি খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বে রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে খনি শিল্প আলোর মুখ দেখেনি। দারিদ্র্য সীমার নিচে দশটি দেশের অর্থনীতি এর তালিকায় গিনি আছে নবম স্থানে।

ইরিত্রিয়া (মাথাপিছু আয়: ১২১০ মার্কিন ডলার) : পৃথিবীর নিশ্চল অর্থনীতি গুলোর মধ্যে ইরিত্রিয়ার অর্থনীতি ব্যবস্থা একটি। দেশটি এ ক্ষেত্র বেশ অনুন্নত। বিচার ব্যবস্থা দুর্নীতি মোকাবেলায় ভাল অবস্থানে নেই। শাসকবর্গও দেশটির উন্নতিতে ভাল কিছু করতে পারছে না। যার কারণে ১৯৯৮ সাল থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ দেশান্তর হতে থাকে। বেসরকারি খাতের অবস্থা হতাশাজনক হওয়ায় দেশের বেশিরভাগ কর্মসংস্থান পাবলিক সেক্টরে। তীব্র ক্ষরার কারণে কৃষিশিল্পের অবস্থাও করুণ। ত্রুটিপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেমনঃ রাষ্ট্রায়ত্ত ভূমি আইন প্রভৃতির কারণে দেশটির অর্থনীতি হোঁচট খেতে থাকবে।

মোজাম্বিক (মাথাপিছু আয়: ১২০৮ মার্কিন ডলার) : দারিদ্র্যতা বিমোচনের জন্য ইতিমধ্যে মোজাম্বিক বেশ কয়েক দফা সংস্কার চালিয়েছে। কিন্তু অপরিকল্পিত সরকারি ঋণ আর মুদ্রাস্ফীতির উর্ধমূখী সূচকের কাছে এসব সংস্কার ব্যর্থ। ২০১৬ সালে স্বাধীনতার পর সবচেয়ে স্থবির প্রবৃদ্ধির বছর পার করেছে মোজাম্বিক। দেশটি বর্তমানে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছে। কিন্তু গ্যাস আর কয়লাজাত পণ্যের চাহিদা বাড়ায় অদূর ভবিষ্যতে সুদিন আসবে বলে আশা করা যায়। দারিদ্র দশটি দেশের অর্থনীতি এর তালিকায় মোজাম্বিক ৪র্থ।

নাইজার ( মাথাপিছু আয়: ১০৬৯ মার্কিন ডলার) : খনিজ সম্পদ থাকা সত্ত্বেও যেসব দেশ অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল, নাইজার তাদের মধ্যে উৎকৃষ্ট উদাহরণ। নাইজারে ব্যাপক পরিমাণ তেল আর ইউরেনিয়াম মজুদ আছে। কিন্তু অস্থিতিশীল আন্তর্জাতিক বাজারের কারণে তারা খুব একটা সুবিধা করতে পারছে না। বিচার ব্যবস্থার ব্যর্থতার কারণে দুর্নীতি ব্যপক আকার ধারণ করেছে। দুর্বল অর্থনৈতিক নীতি আর ভঙ্গুর কাঠামোর কারণে প্রাইভেট সেক্টরের অবস্থা শোচনীয়।

বুরুন্ডি (মাথাপিছু আয়: ৯৫১ মার্কিন ডলার) : বুরুন্ডি বহুলাংশেই কৃষির উপর নির্ভরশীল। দেশটির ৮০ শতাংশ কর্মসংস্থানের যোগান দেয় এই খাত। কিন্তু বুরুন্ডিতে কৃষি অনেকটাই অনিশ্চয়তার উপর রয়েছ।   ব্যাপক আন্দোলন হওয়া সত্ত্বেও বর্তমান প্রেসিডেন্ট ক্ষমতা ছাড়তে অস্বীকার করায় রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এগুলোর কারণে দেশটি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ হারিয়েছে। ফলে অনেক মানুষ দেশত্যাগ করেছে। দুর্বল সরকারব্যবস্থার কারণে ভবিষ্যতে কোনো আশানুরূপ উন্নতি হবে বলে আশা করা যাচ্ছে না। দারিদ্র্য সীমার নিচে দশটি দেশের অর্থনীতি এর তালিকায় বুরুন্ডি আছে পঞ্চম স্থানে।

লাইবেরিয়া ( মাথাপিছু আয়: ৯৩৪ মার্কিন ডলার) : লাইবেরিয়া মূলত ব্যাপক দারিদ্র্যয় আক্রান্ত দেশগুলোর একটি। কিন্তু বর্তমানে আধুনিক যোগ্যতাসম্পন্ন নেতৃত্বের হাতে ক্ষমতা যাওয়ায় দেশটি উন্নয়নের পথে যাত্রা শুরু করেছে। ব্যবসায়িক প্রতিবন্ধকতা দূরিকরণ আর জটিলতা কমানোর মাধ্যমে গত পাঁচ বছরে ৫% এর বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। প্রশিক্ষিত কর্মশক্তি তৈরির জন্য লাইবেরিয়া তাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বড় আকারের পরিবর্তন এনেছে। এতো পরিবর্তন সত্ত্বেও দেশটি সাময়িক সংকটের মোকাবেলায় সফল হতে পারছে না। দুর্নীতির স্ক্যান্ডাল আর ঝণ খেলাফির কারণে বারবার হোঁচট খাচ্ছে। যারজন্য লাইবেরিয়া এখনও পৃথিবীর দরিদ্র দেশগুলোর একটি।

মালাউ ( মাথাপিছু আয়: ৮১৯ মার্কিন ডলার) : দেশের অর্থনীতিকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে মালাউ ব্যাপক সংস্কার চালিয়েছে। পলিসিতে অনেক পরিবর্তন এনেছে যাতে গুরুত্বপূর্ণ প্রাইভেট সেক্টরের প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত হয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগ উৎসাহিত করা যায়। কিন্তু রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপে হয়তোবা দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনায় ব্যত্যয় ঘটচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যখাত আর অবকাঠামোর সংকট থাকায় নাগরিক সেবার মান তুলনামূলকভাবে নিচু। ধারণা করা হয় যে, চলমান দুর্নীতি আর বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা উন্নতির অন্তরায় হয়ে দাড়াতে পারে। যাইহোক, যদি তাদের সংস্কার কার্যক্রমের পূর্ণ বাস্তবায়ন ঘটায়, তাহলে হয়তোবা মালাউ ভবিষ্যতে আলোর মুখ দেখতে পারে।

গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র ( মাথাপিছু আয়: ৭৫৩ মার্কিন ডলার) : স্বাধীনতার পর থেকে কঙ্গো বেশ কয়েকবার গৃহযুদ্ধ আর বিশৃঙ্খলার শিকার হয়েছে। দেশটিতে সর্বদা রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজমান। সাবেক শাসকরা ক্ষমতায় থাকাকালে ব্যাপক পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করে। দেশটিকে গৃহযুদ্ধ প্রধানত সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে। আশিটির বেশি নৃগোষ্ঠী থাকায় তাদের মধ্যে শান্তি স্থাপনের প্রচেষ্টাও দুষ্কর। বৈদেশিক ঋণের বোঝা আর মুদ্রাস্ফীতির উর্ধগতির কারণে অর্থনীতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র ( মাথাপিছু আয়: ৬৩৬ মার্কিন ডলার) : গত তিন বছরের রাজনৈতিক সহিংসতা মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের গতিশীল অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। অর্থনীতির স্থিতিশীলতা আর দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। প্রজাতন্ত্র সবচেয়ে বেশি নির্ভর করে কৃষি আর ডায়মন্ড আহরণের উপর। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতায় এই দুটি ক্ষেত্র বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পার্সোনাল আর কর্পোরেট, উভয় ক্ষেত্রেই করের বোঝা বৈদেশিক বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। যার কারণে দেশটির অর্থনীতি বেশ শ্লথ।

উপনিবেশ শাসনের পর থেকে আফ্রিকার অর্থনীতি এখনো আলোর মুখ দেখেনি। অর্থনেতিক অস্থিরতা আর মুদ্রাস্ফীতি যেভাবে জিম্বাবুয়েকে ঘায়েল করেছে, সেটা প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য শিক্ষা হয়ে থাকবে। গৃহযুদ্ধ আর রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে জিডিপির হার শোচনীয়। কিন্তু তারপরও রাজনীতিবিদরা ফাঁকাবুলির মাধ্যমে জনগণকে প্রতারিত করে চলছেই। দারিদ্র্য সীমার নিচে দশটি দেশের অর্থনীতি সস্পর্কে আলোচনা করা হলো।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

প্রজেক্ট প্রোফাইল: প্রবাসীদের হেল্পিং হ্যান্ড (Migrants' Helping Hand)

  প্রজেক্ট প্রোফাইল: প্রবাসীদের হেল্পিং হ্যান্ড (Migrants' Helping Hand)   উদ্যোক্তা: মো. তাকবীর হোসেন, সিইও, কেআর গ্লোবাল লিমিটেড ও গ্...