রবিবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০২১

ইংল্যান্ডের লন্ডনে অবস্থিত টেমস নদী

ইংল্যান্ডের লন্ডনে অবস্থিত টেমস নদী


সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে শাসন করেছিলেন রাজা জেমস। সে সময় তিনি একবার কর্পোরেশন অব লন্ডন থেকে ২০,০০০ পাউন্ড দাবি করেছিলেন। কিন্তু লন্ডন শহরের মেয়র একটি পাউন্ডও দিবেন না। ক্ষিপ্ত রাজা বার্তা পাঠালেন- ‘আপনাকে ও আপনার শহরকে চিরতরে ধ্বংস করে দেব। আমার আইন আদালত, এমনকি প্রাসাদকে এবং আমার আইনসভাকে উইনচেস্টার নয়তো অক্সফোর্ডে স্থানান্তরিত করব। এবং ওয়েস্টমিনিস্টারকে জনশূন্য করে ফেলব। 

আপনার কী হবে ভেবে দেখুন!’ কিন্তু মেয়র একটুও না ঘাবড়ে বললেন- ‘লন্ডনের বণিকদের জন্য সব সময় সান্ত্বনা থাকবে হে মহামহিম রাজা! কারণ আপনি সব নিলেও আপনার সঙ্গে টেমস নদীকে নিয়ে যেতে পারবেন না।’ হ্যা, খ্রীস্টপূর্ব ৫৫ সালে জুলিয়াস সিজারের নাম দেয়া নদী টেমেসাস বা টেমসকে কেউ আজও নিয়ে যেতে পারেনি। 

লন্ডন শহরের ক্রমবর্ধমান বিস্ময়কর উন্নতির পিছনে টেমস নদী একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । মধ্যযুগের সময়কালে লন্ডন এক অন্যতম বিখ্যাত শহর ছিল এবং জাহাজ(নৌ-বানিজ্য) দ্বারা তার সম্পদ বর্ধিত করতে থাকে যা সারা বিশ্বে ভ্রমণ করত এবং লন্ডন বন্দরের নোঙ্গর ঘাঁটিতে ফিরে আসত।

প্রাথমিকভাবে পরিবহণ ও বিনোদনের জন্য এই নদী আগের তুলনায় বর্তমানে অনেক বেশি ব্যবহার করা হয়। টেমস নদী আমোদ-প্রমোদ এবং বানিজ্যের এক নদী।আমোদ-প্রমোদ ও বিনোদনের একটি উৎস হিসাবে টেমস নদীর জনপ্রিয়তা ভিক্টোরিয়ান আমল থেকেই চলে আসছে এবং আনন্দময় সমুদ্র ভ্রমণের ধারণা একটি স্বতন্ত্র্র ভিক্টোরিয়ান কৌশল।

আপনি লন্ডনের এই নদীতে যেকোন ক্রুজেই ভ্রমণ করুন না কেন আপনি একটি অসাধারণ ভ্রমণ অভিজ্ঞতা পাবেন এই ব্যাপারে নিশ্চিত থাকতে পারেন। এখানে বহু অসাধারণ ক্রুজ রয়েছে, তার মধ্যে কিছু হল - সিটি ক্রুজ, ক্যাটামারান ক্রুজ ও সার্কুলার ক্রুজ।উদাহরণস্বরূপ ধরুন, ক্যাটামারান ক্রুজ যা উভয়- বৃত্তাকার ভাবে সেইসাথে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণ প্রদান করে।অন্যদিকে সার্কুলার ক্রুজ এমব্যাঙ্কমেন্ট জেটি থেকে প্রস্থান করে সেন্ট ক্যাথারিন জেটি পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে থেমে থেমে যায়, যার মধ্যে আপনি নিকটবর্তী দর্শনীয় স্থানগুলি অন্বেষণ করার সুযোগ পাবেন।

নৌচালন জল ক্রীড়া 1800 সালের প্রথম দিকে খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যার ফলে নৌচালন ক্লাব গুলি লন্ডনের টেমস নদীর চারপাশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে এবং রিগাট্টা (নৌচালনা প্রতিযোগিতা) এখানকার এক জনপ্রিয় কার্যক্রম হয়ে ওঠে।বিখ্যাত হেনলি রিগাট্টা 1839 সাল থেকে চলে আসছে যা গ্রেট ব্রিটেনের এক অত্যন্ত জনপ্রিয় কার্যক্রম, যা প্রতি বছর জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়াও যতদূর জানা যায় রোয়িং, পুন্টিং এবং সেলিং টেমস নদীর কিছু জনপ্রিয় কার্যক্রম।

এখানকার আরো দুটি পরিদর্শনযোগ্য আকর্ষণীয় হল স্বয়ং এই নদী এবং টেমস নদীর হেনলিতে অবস্থিত রোয়িং মিউজিয়াম। ঐতিহাসিক নিদর্শনের কিছু নিদারুণ সংগ্রহ সহ এখানে একটি মিউজিয়াম রয়েছে। আপনি এই মিউজিয়ামে এক উদ্ভাবনী পদ্ধতিতে টেমস নদীর ঐতিহাসিক তাৎপর্য এবং নৌচালন ক্রীড়ার বিবর্তন পরিবেশন করা দেখে সত্যিই আশ্চর্য হয় উঠবেন।

এছাড়াও মিউজিয়ামটি হেনলীর তাৎপর্য্যময়তা প্রদর্শিত করে এবং যা লন্ডনের মতো নয়, এটি রোয়িং মিউজিয়াম প্রত্যেকটি পরিদর্শনের জন্য মূল্য দিতে হয়। একটি ভিডিওর মাধ্যমে টেমস নদীর উপস্থাপনায়, যা হেলিকপ্টার থেকে এরিয়ালি ধারণ করা হয়েছে , দর্শকদের পরিচিত করায় যে টেমস নদীর উৎস সাগরের সাথে।

ব্রিটিশ লোকসাহিত্যে টেমস নদীর অবদান অপরিসীম এবং অসংখ্য লেখক, কবি এবং সাঙ্গীতিক তাদের বিভিন্ন শিল্প কর্ম, যেমন - উপন্যাস, ছোটগল্প, কবিতা এবং সঙ্গীতে এই মহান নদীর নানাবিধ বৈশিষ্ট্য চিত্রিত করেছেন।

এই মহিমান্বিত এবং নিদারুণ নদী ছাড়া জীবন কি রূপ হতে পারে? টেমস নদী ইতিহাসের কিছু সবচেয়ে অত্যাশ্চর্য এবং আড়ম্বরপূর্ণ জল প্রদর্শনীর মঞ্চ হিসেবে কাজ করে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এক নদী উৎসব হল ডগেট’স রেস যা এই রেসের প্রবর্তক টমাস ডগেটকে সম্মান প্রদর্শন করতে নদীর নৌ-চালকদের দ্বারা 1751 সাল থেকে পালিত হয়ে আসছে।এই রেস প্রতি বছর 1লা আগস্ট অনুষ্ঠিত হয়।

ইংল্যাণ্ডের বহু রাজা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা টেমস নদীর তীরে তাদের বিরাট দুর্গ ও কেল্লা নির্মান করেছিলেন যেগুলির মধ্যে কিছু কিছু আজও চোখে পড়ে।

টেমস নদী মানচিত্র

টেমস নদী সম্পর্কিত তথ্যাবলী:

  • বর্তমানে আপনি এই নদী গুলির চারিপাশের সড়ক হয়ে ঘোরাফেরা করলে আপনি জ্যামাইকা রোড, ইস্ট ইন্ডিজ ডকস ইত্যাদি নামে কিছু সড়ক দেখতে পাবেন যেগুলি সেই দেশের নামানুসারে হয়েছে যেখান থেকে জাহাজ গুলি এসেছে।
  • 19,000টি অসাধারণ বোট টেমস নদীতে চলাচলের অনুমতিপ্রাপ্ত।
  • টেমস নদীকে ‘স্ট্রিং অফ পার্ল’ 'হিসেবে গণ্য করা হয়, কারন এই নদীর তীরে বহু রাজকীয় ভবন এবং মহীয়ান গীর্জা রয়েছে।

টেমস নদী কোথায়?

টেমস নদী ইংল্যান্ডের দক্ষিণ অংশ দিয়ে প্রবাহিত হয়।এটি ইংল্যান্ডের সর্ব দীর্ঘতম নদী এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম দীর্ঘ নদী। একদিকে এই নদীর এক বিশাল অংশ মধ্য লণ্ডনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হলেও এই নদী অন্যান্য বিভিন্ন এলাকা দিয়ে প্রবাহিত হয়,যেগুলি হল - রিডিং, হেনলি অন টেমস, কিংস্টন-আপন-টেমস, উইন্ডসর এবং রিচমন্ড।

 টেমস নদীর উৎপত্তি দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডের কটসওল্ড গিরিশ্রেণির জলপ্রবাহ থেকে। এটি পূবদিকে ৩৫০ কিলোমিটার পথ বেঁকে যায়। এখন এর সঙ্গে অন্যান্য নদী এসে মিলিত হয়ে শেষ পর্যন্ত ২৯ কিলোমিটার প্রশস্ত মোহনার মধ্য দিয়ে উত্তর সাগরে গিয়ে মিশেছে। যুক্তরাজ্যে এত বড় নদী আর নেই তা বললে ভুল হবে। ওয়েলসের কার্ডিফে সেভেরন নদীর দৈর্ঘ্য ৩৫৪ কিলোমিটার। কিন্তু সেভেরন দৈর্ঘ্যে বড় হলেও টেমসের ঐতিহাসিক গুরুত্বের কাছে একেবারেই নগণ্য।


টেমস নদীর পরিদর্শন করার সেরা সময় –

সাধারণত গ্রীষ্মকাল লন্ডন পরিদর্শনের সেরা সময় হিসেবে গণ্য হয়। তবে প্রতি বছর সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত মেয়র টেমস উৎসব উপেক্ষা করা উচিৎ নয়।

টেসম নদীর উপরে বেশ কয়েকটি ব্রিজ রয়েছে। বলে রাখা ভালো, নদীর উপর পাথুরে সেতু আর নৌপুলিশ- এই দুটির প্রথম সাক্ষীও কিন্তু এই টেমস নদী। ১২০৯ সালে ৩০ বছরব্যাপী টেমস নদীর ওপর পাথরের তৈরি এক সেতুর কাজ শেষ হয়েছিল। যেটা ইউরোপে প্রথম নির্মিত সেতু। অসাধারণ কাঠামোর ওপর দোকানপাট, ঘরবাড়ি ও এমনকি একটা গির্জাও ছিল, সেটাতে দুটো টানাসেতু ছিল আর প্রতিরক্ষার জন্য এর দক্ষিণ পাড়ে ছিল টাওয়ার। তবে এখানে এক সময় ঘিঞ্জি অবস্থা সৃষ্টি হয়। নোঙ্গর করা জাহাজগুলোতে বেড়ে যায় চুরি। এই সমস্যা মোকাবিলার জন্য লন্ডনে বিশ্বের প্রথম নদীপথে পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল, যা আজও আছে। আমাদের দেশের মতো এই নদীতে যত্রতত্র কেউ পাড়ে নামতে পারেন না। আছে নদীর বুকে ঘুরে বেড়ানোর জন্য নির্দিষ্ট স্থান থেকে পর্যটন জাহাজ। দুই পাড়ে নদীর ঘাট থেকে পর্যটকদের সেই জাহাজে চড়ার অপেক্ষায় দেখা গেলো। একটা সময় রাজা-রানীদের অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্র ছিল এই নদী। যে কারণে এর পাশে তারা গড়ে তুলেছিলেন প্রাসাদ। সেই বড় বড় প্রাচীন শত বছরের প্রাসাদের সঙ্গে এখন টেমস নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে আধুনিক হোটেল, বাণিজ্যিক ভবন। তবে এর ঐতিহ্য মিলিয়ে যায়নি এক ফোঁটাও।  


এখনো নদীর উপর সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে লন্ডন ব্রিজ যার আসল নাম টাওয়ার ব্রিজ। যার নিচ দিয়ে বড় জাহাজ গেলে তা দু’ভাগ হয়ে যায়। এছাড়াও ঢংঢং আওয়াজে নগরবাসীর ঘুম ভাঙাতে, কাজের সময় জানাতে আছে ‘বিগ বেন’ ঘড়ি।  টেমসের উপর আছে ছোট-বড় অনেক সেতু। দুই ধারে আছে হাঁটার জন্য চওড়া রাস্তা। যেসব সড়কে এক সময় সদর্পে ঘোড়া হাঁকিয়ে বেড়িয়েছেন রাজা, রানী, রাজপুত্ররা। রানীর দেশের মন ভালো করে দেয়া নদীর পাড়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়েছে এই ‘টেমস’ যদি সঙ্গে নিতে পারতাম! তাহলে বাংলাদেশেও কী আসতো এমন ‘সমৃদ্ধি?’

নিকটস্থ আকর্ষণ: ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবে, হাউস অফ লর্ডস, বিগ বেন, ইম্পেরিয়াল ওয়ার মিউজিয়াম, লন্ডন টাওয়ার।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

প্রজেক্ট প্রোফাইল: প্রবাসীদের হেল্পিং হ্যান্ড (Migrants' Helping Hand)

  প্রজেক্ট প্রোফাইল: প্রবাসীদের হেল্পিং হ্যান্ড (Migrants' Helping Hand)   উদ্যোক্তা: মো. তাকবীর হোসেন, সিইও, কেআর গ্লোবাল লিমিটেড ও গ্...