দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অজানা কিছু নৃশংসতার চিত্র
যুদ্ধ ভালো কিংবা খারাপ উদ্দেশ্যে হোক, যুদ্ধ মানেই অশান্তি, লাখো প্রাণের অকাল মৃত্যু, তিলে তিলে গড়া শহরের বিধ্বস্ত রূপ। যুদ্ধ আসলেই থমকে দাঁড়ায় দৈনন্দিন জীবনযাত্রা। তারপরও যুদ্ধ থেমে নেই। মানব ইতিহাসের শুরু থেকেই যুদ্ধ চলে আসছে। কিন্তু যত যুদ্ধই হোক, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কাছে এসে থমকে দাঁড়ায় সব যুদ্ধের ইতিহাস। কারণ ছয় বছরব্যাপী এ যুদ্ধ কেড়ে নিয়েছে সামরিক-বেসামরিক পাঁচ কোটি প্রাণ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে খারাপ দিক হলো, এ যুদ্ধে সৈন্যদের চেয়েও বেশি মারা গেছে বেসামরিক জনগণ। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে অক্ষ এবং মিত্র, উভয় শক্তি হত্যা করেছিল লাখো মানুষ এবং ধ্বংস করেছিল অসংখ্য শহর। এক্ষেত্রে অক্ষ শক্তি অর্থাৎ জার্মানি, জাপান ও ইতালি যে এগিয়ে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু মিত্রশক্তিও কম ক্ষতিসাধন করেনি। উদাহরণস্বরূপ, ব্রিটিশরা তাদের সৈন্যদের জন্য খাদ্য মজুদ করার ফলে ভারতবর্ষে যে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, তাতে ৩০ লাখের বেশি লোক মারা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে এরকম আরো বহু বেদনাদায়ক গল্প ছড়িয়ে আছে ইতিহাসের পাতায়। কিন্তু সবগুলো গল্প সবসময় বইয়ের পাতায় পাওয়া যায় না। কিছু ঘটনা চাপা পড়ে আরো অধিক বেদনাদায়ক ঘটনা নিচে অথবা কিছু ঘটনা ধামাচাপা দেয়া হয় মিত্রশক্তির সংশ্লিষ্টতা থাকার কারণে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রচলিত নয়, এমন কিছু নৃশংস ঘটনা দিয়ে সাজানো হয়েছে এ ফিচারটি।
শিশু অপহরণ
হিটলার ও তার নাৎসি বাহিনীর অমানবিক কর্মকাণ্ডগুলোর একটি ছিল দখলকৃত দেশসমূহ বিশেষ করে পোল্যান্ড থেকে নীল চোখ ও সোনালি চুলের শিশুদের অপহরণ করা। ধারণা করা হতো, এ শিশুরা খাঁটি আর্য রক্তের অধিকারী এবং অন্য কোনো নিচু জাতির রক্ত এদের দেহে মিশ্রিত হয়নি। তাদেরকে অপহরণ করে জার্মান ভাষা শেখানো হতো ও জার্মান পরিচয়ে বড় করা হতো। এ কাজের পিছনে মূল লক্ষ্য ছিল জার্মান জাতির সংখ্যা বৃদ্ধি এবং শক্তিশালী ও অপরাজেয় জার্মান জাতি গঠন।
প্রতি বছর ৮-১০ বছর বয়সী পোলিশ শিশুদের রক্তের বিশুদ্ধতার ভিত্তিতে দু’ভাগ করা হতো- ‘মূল্যবান’ ও ‘মূল্যহীন’। মূল্যহীনদের পাঠানো হতো লেবার ক্যাম্পে অথবা বিভিন্ন পরীক্ষাগারে, যেখানে তাদের উপর নানা অমানবিক এক্সপেরিমেন্ট চালানো হতো। আর মূল্যবান্দের জার্মান এতিমখানায় জার্মান পরিচয়ে বড় করা হতো। অনেককে নিঃসন্তান জার্মান দম্পতিরা দত্তক নিত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে হিটলারের এসএস বাহিনী সমগ্র ইউরোপ থেকে এরকম চার লাখ শিশু মা-বাবার কোল থেকে ছিনিয়ে নেয়। তন্মধ্যে শুধু পোলিশ শিশুর সংখ্যা ছিল দু’লাখ। যুদ্ধ শেষ হলে তাদের অনেককে প্রকৃত মা-বাবার কাছে ফিরিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু আসল পরিচয় ভুলে যাওয়ায় বহু শিশুকে ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব হয়নি।
দ্যা ডেথ রেলওয়ে
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মূল হোতা অক্ষশক্তির অন্তর্ভুক্ত জার্মানি ও ইতালি যুদ্ধ করছিল ইউরোপ ও আফ্রিকায় এবং জাপান যুদ্ধ করছিল প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও দক্ষিণ এশিয়াতে। জাপানের লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশ বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) দখল করা। বার্মাতে সৈন্য ও অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে যাওয়ার জন্য জাপান থাইল্যান্ড থেকে বার্মা পর্যন্ত ৪১৫ কি.মি দীর্ঘ রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। এজন্য কাজে লাগানো হয় আড়াই লাখ এশিয়ান ও ষাট হাজার যুদ্ধবন্দীকে, যদিও যুদ্ধবন্দীদের দিয়ে কাজ করানো আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।
কিন্তু দুর্গম বন-জঙ্গল ও পাহাড়-পর্বতের মাঝ দিয়ে রেলপথ নির্মাণ এত সহজ কথা ছিল না। পাথরের পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করতে শ্রমিকদের জান বের হওয়ার জোগাড়। এর উপর মড়ার উপর খাড়ার ঘা হিসেবে যুক্ত হয়েছিল মহামারী, খাদ্য সংকট, দূর্ঘটনা এবং কাজ তাড়াতাড়ি করার জন্য জাপানিদের নির্যাতন। ফলে নির্মাণ কাজ চলাকালে বিভিন্নভাবে মারা যায় ১৩ হাজার যুদ্ধবন্দী ও এক লাখ এশিয়ান শ্রমিক। যুদ্ধ শেষ হলে এ মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য ৩২ জন জাপানি অফিসারকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। রেলপথটি নির্মাণের কাহিনীকে উপজীব্য করে পিয়েরে রোল লিখেছেন বিখ্যাত উপন্যাস ‘The Bridge on the River Kwai”. উপন্যাসটি অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রও সমালোচক মহলে প্রশংসিত হয়েছে।
ধর্ষণের মহামারী
যুদ্ধ নারীদের জন্য কিরুপ ভয়াবহ হতে পারে, সেটা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের করুণ ইতিহাস থেকে আমরা ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এর ব্যতিক্রম নয়। তবে এক্ষেত্রে বরাবরের মতো অভিযোগের তীর নন্দঘোষ জার্মানির দিকে নয়, বরং বর্তমানে শান্তিপ্রিয় দেশ নামে পরিচিত জাপানের দিকে। দখলকৃত অঞ্চলের নারীদের ধর্ষণ এবং হত্যা ছিল জাপানিদের নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। ১৯৩৭ সালে চীনের নানকিং দখলের পর জাপানি বাহিনী ৫০ থেকে ৮০ হাজার নারীকে ধর্ষণ করে। এরকম গণধর্ষণের ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য জাপানের রাজা হিরোহিতো মিলিটারি বেশ্যালয় চালুর নির্দেশ দেন। নানা মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে নারীদের এখানে আনা হতো৷
এদেরকে বলা হতো ‘কমফোর্ট উইমেন’। এদের ৯০ শতাংশ যুদ্ধচলাকালীন সময়ে সৈন্যদের নৃশংসতার কারণে মারা যায়। জাপানিদের তুলনায় জার্মান বাহিনী এক্ষেত্রে ভাল ছিল। কারণ জার্মানিতে ইহুদি নারীদের সাথে দৈহিক মিলন আইনত নিষিদ্ধ ছিল। তারপরও নাৎসি বাহিনীর হাতে ধর্ষণের কিছু ঘটনা ইতিহাসে পাওয়া যায়।
মিত্র বাহিনী এক্ষেত্রে পিছিয়ে ছিল না। কিন্ত কথায় আছে, বিজয়ীরা ইতিহাস লিখে। তাই মিত্রবাহিনীর ধর্ষণের ঘটনা খুব একটা আলোচনায় আসে না। বিভিন্ন সূত্রমতে, বার্লিন দখলের পর সোভিয়েত বাহিনীর হাতে ধর্ষিতার সংখ্যা ২০ লাখের বেশি। আমেরিকান, ব্রিটিশ ও ফ্রেঞ্চ বাহিনীর হাতে ধর্ষিতার সংখ্যাও পাঁচ অঙ্কের কম নয়। তবুও গণমাধ্যমের আলোচনায় কেবল জাপানিদেত কথাই বারবার উঠে আসে।
শহরের পর শহর ধ্বংস
যুদ্ধক্ষেত্রে পোড়ামাটি নীতির ব্যবহার নতুন নয়। শত্রুপক্ষ যাতে সহজে অগ্রসর না হতে পারে, সেজন্য ছেড়ে যাওয়া এলাকার শস্যা, রাস্তাঘাট, অবকাঠামো ধ্বংস করাই পোড়ামাটি নীতি। বিশ্বযুদ্ধের সময় সোভিয়েত রেড আর্মি ও নাৎসি বাহিনী পরস্পরের বিরুদ্ধে এ কৌশল ব্যবহার করেছিল। বিপরীত পক্ষের অগ্রগতি রোধের জন্য তারা শহরের পর শহর জ্বালিয়ে দিয়েছিল। আবার শুধু প্রতিহিংসার কারণেও অনেক শহর ধুলোয় মিশে গেছে। যেমন মিত্রবাহিনীর অন্যতম অংশীদার কানাডিয়ান বাহিনী জার্মানি দখলের সময় একটা ছোট শহর আগুন জ্বালিয়ে ধূলিস্যাৎ করে দেয়। কারণ তাদের কমান্ডার কোনো এক স্লাইপারের গুলিতে মারা যায়। গুজব উঠে যে, সে স্নাইপার কোনো সামরিক বাহিনীর সদস্য নয়, এ শহরের বাসিন্দা।
মিত্রবাহিনীর হাতে ধ্বংস হওয়া আরো একটি শহরের উদাহরণ জার্মানির ডেসড্রেন। কৌশলগত দিক থেকে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ না হলেও শুধু লন্ডনে বোমা ফেলার প্রতিশোধ হিসেবে বিমানের গোলায় এ শহরটিকে আক্ষরিক অর্থেই ধুলোয় মিশিয়ে দেয়া হয়। বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে জাপানের আত্মসমর্পণ তরান্বিত করার জন্য টোকিওতে ৪১ বর্গমাইল এলাকায় ফেলা হয় ১৭০০ টন বোমা। এছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের করালগ্রাসে ধ্বংস হওয়া শহরের তালিকায় আছে বার্লিন, হ্যামবার্গ, ওসাকা, হিরোশিমা, নাগাসাকি প্রভৃতি।
ইউনিট ৭৩১
কখনো ভাবতে পারেন, গবেষণার নামে জীবন্ত অবস্থায় আপনার শরীর থেকে হাত-পা কেটে নেয়া হচ্ছে? ভাবতে বিভৎস লাগলেও এভাবে জীবন্ত মানুষকে গিনিপিগ বানানো হয়েছিল জাপানি বাহিনীর বিশেষ গবেষণাগার ইউনিট ৭৩১ এ। চীনের মাঞ্চুরিয়াতে স্থাপিত এ গোপন গবেষণাগারের প্রধান ছিল শিরো ইশি নামের এক ডাক্তার। এখানে উৎপাদন করা হতো অ্যানথ্রাক্স, প্লেগ, যক্ষ্মা জীবাণু এবং সেগুলো বন্দিদের উপর প্রয়োগ করে চালানো হতো নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। কখনো বন্দীকে উল্টো করে ঝুলিয়ে পরীক্ষা করা হতো, এভাবে মানুষ কতক্ষণ বাঁচতে পারে। যুদ্ধক্ষেত্রে হাত-পা হারালে সৈন্যরা কতক্ষণ বাঁচতে পারে, সেটা জানার জন্য বন্দীদের হাত-পা কেটে মৃত্যু পর্যন্ত ফেলে রাখা হতো। এরকম আরো বহু অমানবিক পরীক্ষার সাক্ষী মাঞ্চুরিয়ার ইউনিট ৭৩১। এসব পরীক্ষার শিকারদের অধিকাংশ ছিল চাইনিজ৷ কারণ হিটলার যেমন ইহুদিদের নিচু বংশজাত মনে করত, জাপানিরাও তেমন চাইনিজদের নিচু মনে করত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে ১৯৪৫ সালে জাপানের যখন বেহাল দশা, তখন শিরো ইশির উপর দ্বায়িত্ব বর্তায় এতদিনের গবেষণাকে কাজে লাগিয়ে একটি জীবাণু যুদ্ধের পরিচালনা করার। অপারেশনের পোশাকি নাম “অপারেশন চেরি ব্লোজম এট নাইট”। পরিকল্পনা ছিল, আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়াতে ছড়িয়ে দেয়া হবে ভয়ঙ্কর কোনো মহামারীর জীবাণু। অপারেশন বাস্তবায়নের জন্য জাপানের পক্ষ থেকে কয়েকটি সাবমেরিন ও দ্রুতগামী যুদ্ধবিমান বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু ততদিনে জাপানের বিদায় ঘণ্টা বেজে গেছে। তাই এ অপারেশন বাস্তবতার মুখ দেখেনি। অপারেশনটি বাস্তবায়িত হলে বিশ্ববাসীর কপালে যে চরম দুর্ভোগ ছিল, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণে মহামারী শুধু আমেরিকাতে সীমাবদ্ধ থাকত না, সাম্প্রতিক করোনা ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়ত পুরো বিশ্বে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন