
ছবি: মিশর
প্রাচীন মিশর সভ্যতা থেকে এ যাবতকালে নানা রহস্যের নিদর্শন মিলেছে। মিশরে বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী ধারাবাহিক সভ্যতাটি অবস্থিত। আনুমানিক ৩০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ঊর্ধ্ব ও নিম্ন মিশ একীভূত হয়ে বর্তমান মিশরের জন্ম হয়। মিশরের ইতিহাসের প্রথম ২৫০০ বছরের প্রায় পুরোটা জুড়েই স্থানীয় রাজা ও রানিরা দেশটি শাসন করেন।
মিশরের প্রাচীন ইতিহাসকে পুরাতন, মধ্য ও নতুন রাজ্য এই তিন পর্বে ভাগ করা হয়েছে। এগুলোকে ধারাবাহিকভাবে ৩১টি রাজবংশ শাসন করে। মিশরের পিরামিডগুলো পুরাতন রাজ্যের সাক্ষী, ওসিরিসের ধর্মীয় গোত্র ও উৎকৃষ্ট ভাস্কর্যশিল্প মধ্য রাজ্যের সাক্ষ্য বহনকারী এবং মিশরীয় সাম্রাজ্য ও ইহুদীদের দেশত্যাগের ঘটনাগুলো নতুন রাজ্যের সময়ে ঘটেছিল। মিশরের বিভিন্ন যুগ সম্পর্কেই আজকে জানানো হবে। এর প্রথম পর্বে আপনারা একেবারেই প্রাথমিক মিশরীয় যুগ সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন, আজ থাকছে এর দ্বিতীয় পর্ব।
প্রথম অন্তর্বর্তী যুগ (খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ২১৮১ থেকে ২০৫৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত)
প্রাচীন মিশরের পুরাতন রাজত্বের শেষ দিকে অর্থাৎ ষষ্ঠ রাজবংশের শাসন সমাপ্তির পর রাজ্যের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অনেকটা অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। এসময় বিভিন্ন অংশের গভর্নররা ফারাওয়ের সাহায্য পেতে ব্যর্থ হয়। অস্থিতিশীল পরিবেশে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। বিশৃঙ্খল পরিবেশে খাদ্য সঙ্কট দেখা দেয়। এই সঙ্কটের সময়ে প্রাচীন মিশরে দুটি পৃথক রাজ্যের উদ্ভব ঘটে।
২১৬০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে হেরাক্লেওপোলিসের শাসকরা উত্তরে নিম্ন মিশর শাসন করতে থাকে। পক্ষান্তরে তাদের প্রতিপক্ষ ইন্তেফ শাসকরা দক্ষিণের উচ্চ মিশরের শাসন করতে থাকে। উচ্চ মিশরের শাসন পরিচালিত হত থিবেস কেন্দ্রিক। থিবেসের শাকদের সঙ্গে হেরাক্লেওপোলিসের শাসকদের শত্রুতা বাড়তে থাকে। সেই সঙ্গে থিবেসের শাসকদের ক্ষমতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়।

পিরামিড
মধ্যকালীন রাজ্য: ১২তম রাজবংশ (২০৫৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ১৭৮৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত)
একাদশ রাজবংশের শেষ শাসক চতুর্থ মেন্তুহোটেপ গুপ্তহত্যার শিকার হলে তার মুখ্যমন্ত্রী সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি রাজা প্রথম আমেনেমহেট হিসেবে পরিচিত। প্রথম আমেনেমহেট ১২তম রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। দ্বিতীয় মেন্তুহোটেপ এবং তার প্রতিষ্ঠিত ১১তম রাজবংশের ফারাওদের রাজধানী ছিল থিবেসে।
১২তম রাজবংশের শাসন প্রচলিত হওয়ার পর প্রথম আমেনেমহেট মেম্ফিসের দক্ষিণে ইশতাওয়িতে নতুন রাজধানী প্রতিষ্ঠিত করেন। তবে থিবেস একটি মহান ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে থেকে যায়। প্রাচীন মিশরের মধ্যকালীন সময় মিশর আবারো পুরাতন রাজত্বের মতো সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল।
১২তম রাজবংশের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকাতা নিশ্চিত করা। সে কারণে ফারাওয়ের সঙ্গে একজন সহশাসক নিযুক্ত করা হত। এই প্রথা প্রথম আমেনেমহেটের সময় থেকেই প্রচলিত ছিল। মধ্যকালীন রাজত্বের সময় ফারাওরা আগ্রাসী বৈদেশিক নীতি অনুসরণ করে। তারা নুবিয়াকে নিজেদের উপনিবেশে পরিণত করে।

অনেক রাজা রানি মিশর শাসন করেছেন
প্রাচীন মিশরের মধ্যবর্তী যুগে বৃহৎ পরিসরে খনি খনন, সামরিক দুর্গ নির্মাণ এবং বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। পুরাতন রাজত্বের সময়ের মতো পুনরায় পিরামিড নির্মাণের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পায়। ফারাও তৃতীয় আমেনেমহেটের শাসনামলে মধ্যকালীন রাজত্ব সমৃদ্ধির শীর্ষ পর্যায় পৌঁছেছিল। তার শাসনামল ছিল ১৮৪২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ১৭৯৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত। তবে চতুর্থ আমেনেমহেটের শাসনামলে এই যুগের পতনের সূচনা।
এই রাজবংশের উত্তারাধিকার রীতি অনুযায়ী তার বোন পরবর্তী শাসক নিযুক্ত হয়েছিলেন। রানি সোবকনেফেরু এর শাসনকাল ছিল খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ১৭৮৯ থেকে ১৭৮৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত। রানি সোবকনেফেরু ছিলেন মিশরের প্রথম নারী ফারাও। তার শাসনামল সমাপ্তির মাধ্যমে দ্বাদশ রাজবংশের সময়কাল শেষ হয়।
দ্বিতীয় অন্তর্বর্তী যুগ (১৭৮৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ১৫৬৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত)
প্রাচীন মিশরের ১৩তম রাজবংশের সময় পুনরায় অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছিল। এসময় শাসকরা কেন্দ্রীয় শাসন সংহত করতে ব্যর্থ হয়। ফলে দ্বিতীয় অন্তর্বর্তী যুগে মিশরের কেন্দ্রীয় শাসন বিভক্ত হয়ে পড়ে। রাজকীয় আদালত এবং সরকার পরিচালিত হত থিবেস থেকে।

প্রাচীন মিশরের নিদর্শন
থিবেসের শাসক এবং হিসকোসদের মধ্যে প্রায় ৩০ বছর সংঘাত চলে। প্রথম আহমোস উত্তরের হিসকোসদের বিরুদ্ধে সফল সামরিক অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে মিশর থেকে বিতাড়িত করেন। এরপর তিনি নতুন রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। এর মাধ্যমে প্রাচীন মিশরের নতুন রাজত্বকালের সূচনা হয়।
নতুন রাজ্য (১৫৬৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ১০৮৫ খ্রিশটপূর্বাব্দ)
ফারাও প্রথম আহমোস ছিলেন ১৮তম রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি মিশরকে পুনরায় একত্রিত করেছিলেন। তিনি নুবিয়ার উপর নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেন। এই রাজবংশের শাসনামলে মিশর ফিলিস্তিনে সামরিক অভিযান শুরু করে। তারা মিতাননিয়ান এবং হিট্টাইটদের মতো অন্যান্য অঞ্চলের শাসকদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।
আরো পড়ুন: দুই হাজার বছর ধরে সমৃদ্ধির স্বর্ণযুগে যেভাবে পৌঁছায় মিশর
প্রাচীন মিশরের নতুন রাজ্যের সময়ের শাসকরা নুবিয়া থেকে এশিয়ার ফোরাত নদী পর্যন্ত সাম্রাজ্য প্রসারিত করে। যা বিশ্বের প্রথম মহা সাম্রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। প্রথম আমেনহোতেপ, প্রথম থুতমোজ, তৃতীয় আমেনহোতেপ এর মতো শক্তিশালী শাসকরা এসময় মিশর শাসন করেন। প্রাচীন মিশরের নতুন হাটসেপসুট এর মতো নারীদের ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য। হাটসেপসুট নিজের ছোট সৎ ছেলের পক্ষে রাজ্য পরিচালনা শুরু করেছিলেন। তবে নিজেকে একজন যোগ্য এবং ক্ষমতাধর ফারাও হিসেবে প্রমাণ করেন।
১৮তম রাজবংশের শেষের দিকের শাসক ছিলেন ফারাও চতুর্থ আমেনহোতেপ। তার শাসনামল ছিল ১৩৭৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ১৩৬২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত। তিনি গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়ে বড় ধরণের সংস্কার করেছিলেন। বিশেষ করে তার ধর্মীয় সংস্কার বেশ আলোচিত। ফারাও চতুর্থ আমেনহোতেপ আমন-রে এর পরিবর্তে সূর্যদেবতা অ্যাটনের উপাসনার প্রতি প্রাধান্য দেন।

মিশরের সৌন্দর্য
প্রাচীন মিশরের ১৯ এবং ২০তম রাজবংশের শাসনামল রামেসাইড সময় হিসেবে পরিচিত। রামসেস নামের রাজবংশের জন্য এই নাম দেয়া হয়। মিশরীয় সাম্রাজ্য এসময় দুর্বল হয়ে পড়লেও উন্নত শহর, মন্দির এবং স্থাপত্য নির্মিত হয়েছিল। ইতিহাস থেকে জানা যায়, হজরত মুসা (আঃ) এবং বনি ইসরায়েলদের মিশর থেকে যাত্রা সম্ভবত ফারাও দ্বিতীয় রাজত্বকালে হয়েছিল।
ফারাও দ্বিতীয় রামসেসের রাজত্বকাল ছিল ১৩০৪ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ১২৩৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত। প্রাচীন মিশরের নতুন রাজ্যের সময়ের শুধু ফারাও চতুর্থ আমেনহোতেপ বাদে সব শাসকদের ‘কিং ভ্যালি’ হিসেবে পরিচিত সমাধিস্থলে সমাহিত করা হয়। এর অবস্থান থিবেসের বিপরীতে নীল নদের পশ্চিম তীরে। এখানকার বেশিরভাগ সমাধিস্তম্ভ যুদ্ধবিগ্রহের সময় ধ্বংস প্রাপ্ত হয়। তবে ফারাও তুতেনখামেনের সমাধিস্তম্ভ অক্ষত ছিল। যা ১৯২২ সালে আবিষ্কৃত হয়।
তৃতীয় অন্তর্বর্তী যুগ (১০৮৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ৬৬৪ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ)
তৃতীয় অন্তর্বর্তী যুগে মিশরীয় রাজনীতি, সমাজ এবং সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছিল। ২১তম রাজবংশের সময় বিভিন্ন অঞ্চলের প্রশাসকরা ক্ষমতাধর হয়ে উঠেছিল। এসময় লিবিয়ার কয়েকটি গোত্রের লোকেরা নীল নদের পশ্চিম ব-দ্বীপ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। তারা ক্রমান্বয়ে স্বাধীন হতে থাকে। ৭২৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে কুশীয় রাজা পিয়ে তার নুবিয়ার রাজধানী নাপাতা থেকে এসে থিবেস দখল করেন। তিনি ২৫তম রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রাচীন মিশরের শেষ যুগ এবং আলেকজান্ডারের বিজয় (৬৬৪ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ৩৩২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ)
মিশর তৃতীয় অন্তর্বর্তী যুগে আসেরিয়দের অধীনে চলে যায়। তখন রাজা প্রথম সামতিক মিশরকে আসেরিয়দের থেকে মুক্ত করেন। তিনি আসেরিয়দের সঙ্গে লড়াই করতে গ্রিক এবং লিডিয় সৈন্যদের সাহায্য নিয়েছিলেন। এসময় মিশরে গ্রিকদের প্রভাব বৃদ্ধি পায়। দ্বিতীয় নেকো ৬০৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে আসিরিয়ার সাহায্যার্থে ব্যবিলনীয়, ক্যালডীয়, মেডীয় এবং সিথীয়দের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হন।

বর্তমান মিশর
এরপর মেসডোনিয়ার শাসকরা মিশর শাসন করতে থাকে। খ্রিষ্টপূর্ব ৩১৩ সালে রোমান সম্রাট কোনস্তানতিন খ্রিস্টানদেরকে ধর্মপালনের অনুমতি দিলে মিশরে কপ্টীয় খ্রিস্টাব মন্ডলীর উদ্ভব ঘটে। এরপরে ৬৪২ খ্রিস্টাব্দে এসে আরব মুসলমানেরা মিশর বিজয় করে। এর কয়েক শতাব্দীর মধ্যেই মিশর একটি আরব রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়।
মিশরের অধিবাসীরা ধীরে ধীরে খ্রিস্টধর্ম থেকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়। এসময় মিশর উমায়িদ ও আব্বাসিদ রাজবংশের অধীনে ছিল। ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দে তুর্কি উসমানীয় সাম্রাজ্য মিশরের নিয়ন্ত্রণ হাতে নেয়। এসময় মিশরের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অবনতি ঘটে। ১৭৯৮ সালে ফ্রান্সের সেনাপতি নেপোলিয়ন মিশর আক্রমণ করেন, কিন্তু উসমানীয় সাম্রাজ্য দ্রুত ক্ষমতা ফিরে পেতে সক্ষম হয়।
উসমানীয় সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা মুহাম্মাদ আলিকে ১৮০৫ খ্রিস্টাব্দে মিশরের প্রশাসক বানানো হয়। তিনি দেশটির আধুনিকীকরণের লক্ষ্যে বেশ কিছু সংস্কার সাধন করেন। আলির মৃত্যুর পরে তার পরিবারের সদস্যরা প্রায় ১০০ বছর ধরে মিশরের শাসনভার নিজেদের হাতে রেখে দেন।
আধুনিক মিশর রাষ্ট্রটি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। দেশটির বর্তমান রাষ্ট্রপতি আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি। মিশরকে উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও ইসলামী বিশ্বের একটি আঞ্চলিক শক্তি, এবং বিশ্বমঞ্চে একটি মধ্যম শক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। দেশটি জাতিসংঘ, আরব লিগ, জোট-নিরপেক্ষ আন্দোলন, আফ্রিকান ঐক্য এবং ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন