সিঙ্গাপুরে জাপানি দখলদারিত্ব
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে সিঙ্গাপুরের নাম, যখন জাপান সাম্রাজ্য ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর পতন ও আত্মসমর্পণের পর, ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৪২ তারিখে শহরটির দখল ও কর্তৃত্ব নিয়ে নেয়।
সিঙ্গাপুরের যুদ্ধে ব্রিটিশ, ভারতীয়, অস্ট্রেলীয়, এবং মালয়ী যৌথবাহিনীকে পরাজিত করে জাপানি সামরিক বাহিনী শহরটির দখল নেয়। সিঙ্গাপুর দখল পরবর্তীকালে জাপান, ব্রিটেন, এবং সিঙ্গাপুরসহ বেশ কয়েকটি দেশের ইতিহাসের একটি সন্ধিক্ষণ হয়ে দাঁড়ায়। সিঙ্গাপুরের নাম বদলে রাখা হয় শোনান্তো, যার অর্থ “দক্ষিণ দ্বীপের আলো” এবং একে বৃহত্তর পূর্ব এশিয়া সহ-সমৃদ্ধি বলয় (ইংরেজি: জাপানি পবার্নএর অন্তর্ভুক্ত করা হয়
১২ সেপ্টেম্বর ১৯৪৫ তারিখে তৎকালীন পৌর ভবনে (বর্তমানে সিটি হল) আনুষ্ঠানিক অস্ত্র সমর্পণের পর, সিঙ্গাপুর পুনরায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনে প্রত্যাবর্তন করে। বিশ বছর পর ১৯৬৫ সালে সিঙ্গাপুর একটি সার্বভৌম নগর-রাষ্ট্রে পরিণত হয়। জাপানি শাসনের সেই অভিজ্ঞতা এখনো স্মরণ করা হয় পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষা দিবস পালনের মাধ্যমে, ১৯৪২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জাপানিদের কাছে ব্রিটিশদের আত্মসমর্পণের দিন পালিত হয় এই দিবস।
সিংগাপুরের যুদ্ধ ও মালয় অভিযান
মাত্র দুই মাসের কিছু বেশি সময়ের মালয় অভিযানে (Malayan Campaign) জাপানিরা গোটা মালয় দখল করে নিয়েছিল। দ্বীপটিতে আক্রমণের মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৪২ তারিখে, সিঙ্গাপুরকে প্রতিরক্ষাকারী বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল সিঙ্গাপুরের পতনকে “ভয়াবহ বিপর্যয় এবং ব্রিটিশ ইতিহাসে আত্মসমর্পণের সর্ববৃহৎ নজির” বলে আখ্যা দেন।
কেম্পেইতাই (জাপানি সামরিক পুলিশ), যা ছিল সিঙ্গাপুরের প্রধান দখলদার বাহিনী, তারা সাধারণ জনতার ওপর নানাবিধ নৃশংসতা চালায়। তারা “সুক চিং” নামক একটি ব্যবস্থা চালু করে, চীনা ভাষায় যার অর্থ “পরিশোধনের মাধ্যমে পবিত্রকরণ” (purging through purification)। এটা ছিল বিশেষত তাদের জন্য যারা জাতিগতভাবে চীনা, জাপান সাম্রাজ্যের জন্য যাদের শত্রুভাবাপন্ন বলে গণ্য করা হত (স্থানীয় জনসংখ্যার জাপান–বিরোধী উপাদান)। সুক চিং গণহত্যায় সিঙ্গাপুরসহ প্রতিবেশি মালয়ে ২৫,০০০ থেকে ৫৫,০০০ চীনা বংশোদ্ভূত মানুষ প্রাণ হারায়। এই ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই ছিল পুরুষ, যাদের বয়স ছিল ১৮ থেকে ৫০ এর মধ্যে। তাদেরকে একত্র করে দ্বীপের কোন দূরবর্তী, জনশূন্য স্থানে যেমন – চাঙি সৈকত (Changi Beach), পাঙ্গল পয়েন্ট (Punggol Point), এবং সিগ্ল্যাপ (Siglap) এ নিয়ে যাওয়া হত এবং মেশিন গান ও রাইফেল দিয়ে ধারাক্রমে গুলি করে হত্যা করা হত।
এছাড়াও, কেম্পেইতাই-রা গোটা দ্বীপজুড়ে স্থানীয় গুপ্তচরের নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল, সন্দেহভাজন জাপানি–বিরোধী লোকজন শনাক্ত করার জন্য। এই সব চরদের কেম্পেইতাই গণ ভালো অর্থকড়ি দিত এবং দখলদারি বাহিনীর কাছে এদের বিশ্বস্ততা নিয়ে কোন সন্দেহ ছিল না বলে, গ্রেপ্তার হওয়ার কোন ভয়ও তাদের ছিল না। এই চরেরা কেম্পেইতাই শনাক্তকরণ কেন্দ্রগুলোতে কাজ করত, যেখানে জাপানিরা শাস্তি দেওয়ার জন্য সন্দেহভাজন জাপানি–বিরোধীদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করত। জাপানি সৈন্য এবং কেম্পেইতাইরা প্রায়শই রাস্তাঘাটে টহল দিত এবং তাদের দেখলে সাধারণ মানুষজনকে ঝুঁকে সম্মান দেখাতে হত। যারা এমনটা করতে ব্যর্থ হত, তাদের চড়–থাপ্পড়, সাজা, মারধর এবং এমনকি কাউকে কাউকে হাজতে ঢোকানো বা মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দেওয়া হত।
অন্যান্য পরিবর্তন
পশ্চিমা প্রভাবকে নিরুৎসাহিত করা, দখলদারিত্বের একদম গোড়া থেকেই যেটা জাপানিদের অভিপ্রায় ছিল, সেজন্য তারা বিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে, এবং স্থানীয় লোকজনকে তাদের ভাষা (জাপানি) শিখতে চাপ প্রয়োগ করে। পাঠ্যপুস্তক ও ভাষা নির্দেশিকাসমূহ কেবল জাপানি ভাষায় ছাপানো হত এবং বেতার ও চলচ্চিত্র সম্প্রচার ও প্রদর্শন করা হত জাপানি ভাষায়। প্রত্যহ সকালে, বিদ্যালয়গামী শিশুদের জাপানের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে (সিঙ্গাপুর থেকে যা ছিল উত্তর–পূর্ব দিকে) জাপানের জাতীয় সংগীত (“কিমিগায়ো”) গাইতে হত। সিঙ্গাপুরের সর্বত্র জাপানি প্রচারণা ব্যানার আর পোস্টারে ছেয়ে গিয়েছিল, সেই সাথে জাপানের উদীয়মান সূর্যবিশিষ্ট পতাকা উত্তোলন এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ দালান থেকে ঝোলানো থাকত।
মৌলিক চাহিদার অপ্রতুলতা
দখলদারিত্বের সময় খাদ্য থেকে শুরু করে ওষুধপথ্য পর্যন্ত সব মৌলিক সংস্থানেরই ঘাটতি দেখা দেয়। অধিমুদ্রাস্ফীতির কারণে সাড়ে তিন বছরের মধ্যে অত্যাবশ্যক মৌলিক সামগ্রীর দাম আকস্মিকভাবে বেড়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, চালের দাম প্রতি ১০০ কাটি (catties) (৬০ কি.গ্রা. বা ১৩০ পাউন্ড) $৫ থেকে বেড়ে, আগস্ট–সেপ্টেম্বর ১৯৪৫ এ দখলদারিত্বের শেষ সময়ে $৫,০০০ এ গিয়ে পৌঁছে।
বেসামরিক জনতার মধ্যে বণ্টিত সামগ্রীর পরিমাণ সীমিত করার উদ্দেশ্যে জাপানিরা রেশন কার্ড চালু করে, যা “শান্তির জীবনের সনদপত্র” নামেও পরিচিত ছিল।[৪] প্রতি মাসে প্রাপ্তবয়স্ক এবং শিশুরা জনপ্রতি যথাক্রমে ৫ কেজি (১১ পাউন্ড) এবং ২ কেজি (৪.৪ পাউন্ড) করে চাল কিনতে পারতো। যুদ্ধের অগ্রগতির সাথে সাথে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য বরাদ্দ চালের পরিমাণ ২৫ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয়, কেননা চালের অপ্রতুল সরবরাহ জাপানি সেনাদের খাবারের যোগান হিসেবে পাঠিয়ে দেওয়া হত।
দখলদারিত্বের সময়কালে, জাপানিরা “কলা টাকা” এইসব নোটের গায়ে কলা গাছের ছবি ছাপানো থাকত বলে এমন নাম দেওয়া হয়) নামক এক ধরনের অর্থমুদ্রার প্রচলন করে কেননা ব্রিটিশদের স্ট্রেইট মুদ্রা ক্রমেই বিরল হয়ে আসছিল এবং ১৯৪২ সালে জাপানিরা আসার পর এক সময় বিলুপ্ত হয়ে যায়। তারা সরকার নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি’র কিছু কিছু অনুষঙ্গ প্রবর্তন করে যেখানে জিনিসপত্রের চাহিদা ও যোগানের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এর ফলে একটি জনপ্রিয় কালোবাজার সৃষ্টি হয় যেখান থেকে স্থানীয়রা প্রধান কিছু অত্যাবশ্যকীয় সামগ্রী যেমন– চাল, মাংস এবং ওষুধ কিনতো। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির কারণে “কলা টাকা” ভুগতে শুরু করে এবং এর মান খুব দ্রুত নিম্নমুখী হতে থাকে, কেননা দখলদার কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনমাফিক শুধু টাকা ছাপিয়ে যেত; এর ফলস্বরূপ কালোবাজারে স্ট্রেইট মুদ্রা অধিক প্রচলিত ছিল।
খাদ্যের প্রাপ্যতা ও মান– উভয়েরই ভীষণ অবনতি ঘটে। মিষ্টি আলু , ট্যাপিওকা এবং রাঙা আলু সিঙ্গাপুরিদের প্রধান খাদ্য হয়ে ওঠে, কারণ এগুলো চালের চেয়ে সস্তা ছিল এবং অল্প সময়ে, সহজে বাড়ির পেছনের উঠানে ফলানো সম্ভব ছিল। সেগুলো থেকে মিষ্টান্নসহ দিনের তিন বেলার জন্য নানা পদের খাবার তৈরি করা যেত। এসব খাবার ক্ষুধা নিবারণের জন্য সহায়ক ছিল বটে কিন্তু পুষ্টিগুণ ছিল সীমিত। একঘেয়েমি দূর করার জন্য মিষ্টি আলু, ট্যাপিওকা এবং রাঙা আলু’র সাথে অন্য কিছু মিশিয়ে নিয়মিত নতুন নতুন ধরনের খাবার উদ্ভাবন করা হত। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক এবং জাপানি দখলদার কর্তৃপক্ষ উভয়ই, নিজেদের অল্প পরিমাণ জমি থাকলেও, সেখানে নিজেদের খাদ্য নিজেদেরকেই উৎপাদনের প্রতি স্থানীয় জনগণকে উৎসাহিত করত। এই উৎসাহ এবং উৎপাদন অনেকটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে পশ্চিমা দেশগুলোর (প্রধানত ইউরোপে) “বিজয় উদ্যান” (Victory Gardens) এর মত, যেহেতু তখন খাদ্য সরবরাহে ঘাটতি ছিল।কলমি শাক (Ipomoea aquatica) সহ অন্যান্য শাকসবজি, যেগুলো জলাধারের আশেপাশে মোটামুটি সহজেই ফলানো যেত, সেগুলো বেশ জনপ্রিয় খাদ্যশস্যে পরিণত হয়।
শিক্ষা
সিঙ্গাপুর দখলের পর, মালয়, চীনা, ভারতীয় এবং ইউরেশীয়দের জাপানি ভাষায় দীক্ষিত করার জন্য, জাপানিরা শোনান জাপানি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। আন্ডার অ্যান ইম্পেরিয়াল সান : জাপানিজ কলোনিয়াল লিটারেচার অফ তাইওয়ান অ্যান্ড দ্য সাউথ গ্রন্থের রচয়িতা ফেই ইউয়ান ক্লিম্যান এর ভাষ্যমতে, দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ায় এমন বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এটিই ছিল সফলতম। দখলের সময়কালেই জাপানিরা শোনান ফার্স্ট পিপলস্ স্কুল নামে আরেকটি বিদ্যালয় চালু করে।
মিত্রবাহিনীর অভিযানসমূহ
অপারেশন জেউইক, অপারেশন ব্লাডহাউন্ড, অপারেশন রিমাউ, অপারেশন স্ট্রাগল ও সিঙ্গাপুরে বোমা বর্ষণ (১৯৪৪-৪৫)
জাপানি সামরিক বাহিনীর কার্যক্রম ব্যাহত করার উদ্দেশ্যে, মিত্রবাহিনীর বেশ কতগুলো পরিকল্পিত আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল সিঙ্গাপুর। ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৪৩ সালে, মেজর ইভান লিয়ন এর নেতৃত্বে, জেড–ফোর্স (Z–Force) নামে পরিচিত মিত্রবাহিনীর একটি কমান্ডো দল, সিঙ্গাপুর পোতাশ্রয়ে অনুপ্রবেশ করে সাতটি জাপানি জাহাজ ডুবিয়ে বা ক্ষতিগ্রস্ত করে দেয়, যার সম্মিলিত ভর ছিল প্রায় ৩৯,০০০ দীর্ঘ টন (৪০,০০০ মেট্রিক টন)। একই লক্ষ্য নিয়ে প্রায় এক বছর পর লিয়ন আরেকটি অপারেশনে নেতৃত্ব দেন, যার সাংকেতিক নাম ছিল “রিমাউ”, এবং তিনটি জাহাজ নিমজ্জিত করেন। লিয়ন এবং তার ১৩ জন সহযোগী জাপানিদের সাথে যুদ্ধে নিহত হন। এই অপারেশনের বাকি ১০ জন বন্দি হন, এবং প্রহসনমূলক এক বিচারে (Kangaroo court) গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে অভিযুক্ত হয়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন।
ফোর্স ১৩৬ এর লিম বো সেং আরেকটি অপারেশন পরিচালনা করেন, যার সাংকেতিক নাম ছিল গুস্তাভুস (Gustavus)। তিনি চীন ও ভারত থেকে নিবিড় সামরিক গোয়েন্দা অভিযানের মাধ্যমে শতাধিক গুপ্তচর সংগ্রহ করেন এবং তাদের প্রশিক্ষণ দেন। তিনি ১৯৪২ সালে স্পেশাল অপারেশন্স এক্সেকিউটিভ (SOE) এর ক্যাপ্টেন জন ডেভিস এর সাথে মিলে ফোর্স ১৩৬ নামক একটি চীনা–ব্রিটিশ গেরিলা টাস্কফোর্স গঠন করেন। অপারেশন গুস্তাভুস এর লক্ষ্য ছিল মালয় ও সিঙ্গাপুরজুড়ে গুপ্তচরবৃত্তির নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা ও জাপানিদের ক্রিয়াকলাপ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা, এবং এর মাধ্যমে জাপানিদের কাছ থেকে সিঙ্গাপুর পুনর্দখলের উদ্দেশ্যে ব্রিটিশদের পরিকল্পিত অপারেশন জিপার – এ সহায়তা করা। যুদ্ধ শেষে ফোর্স ১৩৬ ভেঙে দেওয়া হয়।
আগস্ট ১৯৪৫ এ, সিঙ্গাপুর পোতাশ্রয়ে অনুপ্রবেশ করে, নাছোড় মাইন (limpet mine) দ্বারা জাপানি যুদ্ধজাহাজ তাকাও (Takao) এবং মিয়োকো’র (Myōkō) ক্ষতিসাধন করার লক্ষ্যে, যুক্তরাজ্যের রাজকীয় নৌবাহিনীর দুটি XE–শ্রেণির ক্ষুদ্র ডুবোজাহাজ, অপারেশন স্ট্রাগল – এ অংশ নেয়। তারা তাকাও এর ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে, যার জন্য লেফটেন্যান্ট ইয়ান এডওয়ার্ড ফ্রেজার ভিক্টোরিয়া ক্রস (ব্রিটেনের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান) অর্জন করেন। নভেম্বর ১৯৪৪ থেকে মে ১৯৪৫ পর্যন্ত ব্রিটিশ ও আমেরিকান দূর-পাল্লার বোমারু বিমানের লক্ষ্যবস্তু ছিল সিঙ্গাপুর।
নভেম্বর ১৯৪৪ থেকে মে ১৯৪৫ এর মধ্যবর্তী সময়ে, সিঙ্গাপুরের নৌঘাঁটি ও বন্দরগুলো আমেরিকান বিমান ইউনিট কর্তৃক এগার বার বোমা হামলার শিকার হয়। এই হামলাগুলোতে তাদের লক্ষ্যবস্তুর কিছু ক্ষয়ক্ষতি হলেও অনেক বেসামরিক লোক নিহত হয়। তবে অধিকাংশ সিঙ্গাপুরিরা এই হামলাকে স্বাগত জানিয়েছিল, কেননা সেগুলোকে তারা জাপানি শাসন থেকে সিঙ্গাপুরের মুক্তির বার্তা হিসেবে দেখত।
দখলদারিত্বের সমাপ্তি
১২ সেপ্টেম্বর ১৯৪৫ তারিখে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের পর, জাপানি প্রতিনিধদল সিঙ্গাপুর পৌরভবন ত্যাগ করছে।
৬ আগস্ট ১৯৪৫ তারিখে, যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমা শহরে একটি আণবিক বোমা হামলা চালায়। ১৬ ঘণ্টা পর, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস. ট্রুম্যান জাপানকে আবারও আত্মসমর্পণের আহ্বান করেন, নয়তো “আকাশ থেকে এমন ধ্বংসের বর্ষণ অবশ্যম্ভাবী, যা এই পৃথিবী আগে কখনোই দেখেনি”– এই বলে হুঁশিয়ারি জানান।
৮ আগস্ট ১৯৪৫ তারিখে, সোভিয়েত ইউনিয়ন সাম্রাজ্যবাদী জাপানের পুতুল–রাষ্ট্র মাঞ্চুকুও এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং ৯ আগস্ট সেখানে আক্রমণ করে। পরে ঐ একই দিনে, যুক্তরাষ্ট্র জাপানের নাগাসাকি শহরে আরেকটি আণবিক বোমা বর্ষণ করে।
এই ঘটনাগুলোর পর, জাপানের সম্রাট হিরোহিতো হস্তক্ষেপ করেন এবং যুদ্ধ-নির্দেশনা বিষয়ক সর্বোচ্চ পরিষদকে, যুদ্ধ সমাপ্ত করার উদ্দেশ্যে মিত্রবাহিনীর দেওয়া পট্সডাম ঘোষণা’র শর্তাবলি মেনে নিতে আদেশ করেন। আরও বেশ কয়েক দিন ধরে পর্দার আড়ালে চলা আলাপ–আলোচনা আর একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর, ১৫ আগস্ট সমগ্র সাম্রাজ্যজুড়ে সম্রাট হিরোহিতো পূর্বে ধারণকৃত একটি বেতার ভাষণ দেন। জুয়েল ভয়েস ব্রডকাস্ট নামক ঐ বেতার ভাষণে তিনি মিত্রবাহিনীর কাছে জাপানের আত্মসমর্পণের ঘোষণা দেন।
২ সেপ্টেম্বর ১৯৪৫ তারিখে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর রণতরী ইউএসএস মিজৌরিতে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এতে জাপান সরকারের কর্মকর্তাবৃন্দ জাপানি সরঞ্জাম আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন, এবং এর মাধ্যমে সকল বৈরিতার অবসান ঘটে।
১২ সেপ্টেম্বর ১৯৪৫ তারিখে, সিঙ্গাপুর পৌরভবনে একটি সরঞ্জাম আত্মসমর্পণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এরপর পাদাঙে (Padang) কুচকাওয়াজ সহকারে বিজয় উদযাপিত হয়। জেনারেল হিসাইচি তেরাউচি’র পক্ষ হতে আগত জেনারেল সেইশিরো ইতাগাকি’র কাছ থেকে জাপানি বাহিনীর আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ গ্রহণ করতে, দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া কমান্ডে মিত্রবাহিনীর সুপ্রিম কমান্ডার লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন সিঙ্গাপুরে আসেন। আত্মসমর্পণকৃত জাপানি ফৌজকে নিরাপত্তা বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করে, একটি ব্রিটিশ সামরিক প্রশাসন গঠিত হয়েছিল, যা মার্চ ১৯৪৬ পর্যন্ত দ্বীপের তত্ত্বাবধানে ছিল।
জাপানের আত্মসমর্পণের পর, ব্রিটিশরা তখন পর্যন্ত এসে নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ না করায়, সিঙ্গাপুরে এক অস্থিতিশীল অনাচারমূলক অবস্থা দেখা দেয়। জনগণের ওপর জাপানিদের নিয়ন্ত্রণ তখন অনেকাংশেই দুর্বল হয়ে পড়েছিল। সেখানে ব্যাপক হারে লুটতরাজ এবং প্রতিশোধমূলক খুনখারাবি হতে থাকে। বন্দর সুবিধা, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ এবং টেলিফোন পরিষেবাসহ অধিকাংশ অবকাঠামোই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে গিয়েছিল। অর্থনীতি যুদ্ধ–পূর্ব অবস্থায় পৌঁছাতে আরও চার–পাঁচ বছর লেগে যায়। অবশেষে যখন ব্রিটিশ সেনারা এসে পৌঁছে, জনগণ তাদের উল্লাস ও হর্ষধ্বনির মাধ্যমে বরণ করে নেয়।দখলদারিত্বের অবসানের সাথে সাথেই কলা টাকা মূল্যহীন হয়ে পড়ে।
স্মৃতিসৌধসমূহ
জাপানি দখলদারিত্বের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের এর শিক্ষা তুলে ধরতে, সিঙ্গাপুর সরকার বেশ কয়েকটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেছে, যার কয়েকটি প্রাক্তন গণহত্যা-ভূমিগুলোতে অবস্থিত।
বিচ রোডে যুদ্ধ স্মৃতি উদ্যানে অবস্থিত বেসামরিক যুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ। চারটি স্তম্ভ দ্বারা সিঙ্গাপুর অধিবাসী চারটি প্রধান জাতি: চীনা, মালয়, ভারতীয় এবং ইউরেশীয়দের প্রতীকীভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
বিচ রোডের যুদ্ধ স্মৃতি উদ্যানে এর ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত বেসামরিক যুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভটি অবস্থিত। ৬১ মিটার উচ্চতার, চারটি সাদা কংক্রিট স্তম্ভ নিয়ে গঠিত এই স্মৃতিস্তম্ভটি দ্বারা যুদ্ধে নিহত সকল বর্ণের বেসামরিক জনগণের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। ষাটের দশকে শুরুর দিকে, পুনঃনগরায়নের ধুম পড়লে সমগ্র সিঙ্গাপুরজুড়ে সহস্রাধিক দেহাবশেষ আবিষ্কৃত হয়। এরপরই এই সৌধটি নির্মাণ করা হয়। ১৯৬৭ সালে জাপানি দখলদারিত্বের রজতজয়ন্তীতে, সিঙ্গাপুরের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ (Lee Kuan Yew) এই স্মৃতিস্তম্ভটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন।[৯] ১৯৬৬ সালের অক্টোবরে, জাপানি সরকার কর্তৃক ‘রক্ত ঋণ’ এর ক্ষতিপূরণ হিসেবে সিঙ্গাপুরকে দেওয়া ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি অংশ ব্যয় করে এটি নির্মিত হয়।[৯] এর উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী লি বলেন:
আমরা এখানে সমবেত হয়েছি সেই সব নারী–পুরুষকে স্মরণ করতে যারা ইতিহাসের এক আগুনে দুর্ভাগ্যজনকভাবে বলি হয়েছেন…আজ যদি আমরা অতীতের এই শিক্ষাগুলো মনে রাখি, নিজেদের ভবিষ্যতকে নিরাপদ করতে নিজেদের সংকল্প ও প্রতিজ্ঞাকে আরও মজবুত করি, তাহলেই যে নারী–পুরুষদের জন্য আজ আমরা শোকাহত, তাদের মৃত্যু বৃথা যাবে না।[৯]
প্রতি বছর ১৫ ফেব্রুয়ারি এই স্মৃতিস্তম্ভে স্মারক কর্মসূচি (জনগণের জন্য উন্মুক্ত) পালন করা হয়।
এই স্মৃতিস্তম্ভটি চায়নাটাউনের হং লিম কমপ্লেক্সের ভেতরে অবস্থিত। স্মৃতিসৌধের গায়ে খোদাই করে লেখা আছে:
এই স্থানটি ছিল জাপানি সামরিক পুলিশের অস্থায়ী নিবন্ধন কেন্দ্র, কেম্পেইতাই, যেখানে ‘জাপানি–বিরোধী’ চীনাদের শনাক্ত করা হত।
১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৪২ সালে, সিঙ্গাপুর দখলের তিন দিন পর, কেম্পেইতাই মাসব্যাপী সুক চিং নামক একটি ‘জাপানি–বিরোধী অনুষঙ্গ’ শুদ্ধিকরণ কর্মসূচি গ্রহণ করে। কেম্পেইতাই কর্তৃক জিজ্ঞাসাবাদ ও শনাক্তকরণের উদ্দেশ্যে, ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী সকল চীনা পুরুষদের, এবং কোন কোন ক্ষেত্রে নারী ও শিশুদেরকেও, এসব অস্থায়ী কেন্দ্রে হাজিরা দেওয়ার নির্দেশ জারি করা হয়।
যারা এসব যথেচ্ছ শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া উতরে যেত, তাদের মুখমণ্ডল, বাহু কিংবা পোশাকে ‘পরীক্ষিত’ ছাপ দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হত। বাকিরা, যাদের ভাগ্য অতটা সুপ্রসন্ন ছিল না, তাদের সিঙ্গাপুরের উপান্তে নিয়ে গিয়ে তথাকথিত জাপানি–বিরোধী কার্যকলাপের দায়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হত। আনুমানিক দশ হাজারেরও বেশি লোক এভাবে প্রাণ হারান।
যাদেরকে নিষ্কৃতি দেওয়া হয়েছিল, সুক চিং এর যাচাইকরণ তাদের কাছে জাপানি দখলদারিত্বের নিকৃষ্টতম স্মৃতিগুলোর মধ্যে অন্যতম হয়ে ছিল।
৬৬ জন বেসামরিক পুরুষ জাপানি হোজো কেম্পেই (সহায়ক সামরিক পুলিশ) কর্তৃক নিহত হন, চাঙি সৈকতের এই স্থানে পানির ধারে, ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৪২ তারিখে। তারা ছিলেন দশ সহস্রাধিক সেইসব মানুষের অন্তর্ভুক্ত, যারা ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৪ মার্চ ১৯৪২ তারিখের মধ্যে, জাপানিদের সুক চিং অপারেশনের শুদ্ধিকরণের সময়, সিঙ্গাপুরের চীনা জনসংখ্যার মধ্যে জাপানি–বিরোধী বেসামরিক লোক সন্দেহে প্রাণ হারিয়েছিলেন। এখান থেকে কয়েকশ’ মিটার দক্ষিণে, তানাহ্ মেরাহ্ বেসার সৈকতটি (বর্তমানে সিঙ্গাপুর চাঙি বিমানবন্দরের রানওয়ে’র অন্তর্গত) ছিল সর্বাধিক ব্যবহৃত গণহত্যা–ভূমিগুলোর মধ্যে অন্যতম, যেখানে এক হাজারেরও অনেক বেশি চীনা যুবক ও পুরুষগণ প্রাণ হারিয়েছিলেন।
“ ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে, ৩০০–৪০০ বেসামরিক চীনা লোক পাঙ্গল সৈকতের ধারে হোজো কেম্পেই (সহায়ক সামরিক পুলিশ) এর ফায়ারিং স্কোয়াড কর্তৃক নিহত হন। তারা ছিলেন দশ সহস্রাধিক সেইসব মানুষের অন্তর্ভুক্ত, যারা ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৪ মার্চ ১৯৪২ তারিখের মধ্যে, জাপানিদের সুক চিং অপারেশনের শুদ্ধিকরণের সময়, সিঙ্গাপুরের চীনা জনসংখ্যার মধ্যে জাপানি–বিরোধী বেসামরিক লোক সন্দেহে প্রাণ হারিয়েছিলেন। এই সৈকতে যারা প্রাণ হারিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ছিলেন ১,০০০ জন চীনা পুরুষ, যাদেরকে জাপানি সৈন্যরা আপার সেরাঙ্গুন সড়ক এলাকার চীনা সম্প্রদায়ের বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালিয়ে ধরে এনে জড়ো করেছিল।
— জাতীয় ঐতিহ্য বোর্ড
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন