রবিবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০২১

ওয়েস্ট ইন্ডিজ

অন্যান্য দেশের ক্রিকেট দলের মত 'ওয়েস্ট ইন্ডিজ' নির্দিষ্ট কোন একটি দেশের দল না। ক্যারিবীয় অঞ্চলের ৯টা স্বাধীন দেশ (বার্বাডোজ, গায়ানা, জ্যামাইকা, ত্রিনিদাদ এন্ড টোবাগো, এন্টিগুয়া এন্ড বারবুডা, ডমিনিকা, সেইন্ট লুসিয়া এবং সেইন্ট ভিনসেন্ট), ২টা দেশের অংশবিশেষ (নেভিস এবং সেইন্ট কিটস), ৩টা ব্রিটিশ কলোনি (এংগুইলা, ব্রিটিশ ভার্জিন এবং মন্টসেরাট), ১টা ডাচ কলোনি (সেইন্ট মার্টিন) আর USA-এর ১টা দ্বীপ (ইউ এস ভার্জিন) নিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল গঠিত। এবং এদের দলটি একটি সম্মিলিত বোর্ড-এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়।


ক্রিকেট বিশ্বের এক দানবীয় নাম ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজ’। খুব অদ্ভুতভাবে দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে এক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে এই দলটি। পরিবর্তন করে ফেলা হয়েছে পাঁচশটির উপর টেস্ট খেলুড়ে ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজ’ নামক ক্রিকেট দলের নাম। এখন থেকে আর এই পরিচিত নামে শোনা যাবে না বা দেখা যাবে না টিভি পর্দায়। দলটির নতুন পরিবর্তিত নাম হলো শুধু ‘উইন্ডিজ’।

দ্বীপ এলাকা অ্যান্টিলিজ এবং লুকেয়ান দ্বীপপুঞ্জও এ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। ক্রিস্টোফার কলম্বাস কর্তৃক এ অঞ্চল আবিষ্কৃত হবার পর ইউরোপীয়রা ওয়েস্ট ইন্ডিজকে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম দেশ ভারত থেকে এ অঞ্চলকে পৃথকীকরণে প্রয়াস পান। সপ্তদশ শতক থেকে ঊনবিংশ শতক পর্যন্ত ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক অঞ্চল ওয়েস্ট ইন্ডিজ ছিল ব্রিটিশ ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ড্যানিশ ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নেদারল্যান্ডস অ্যান্টিলেজ (ডাচ ওয়েস্ট ইন্ডিজ), ফরাসী ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং স্প্যানিশ ওয়েস্ট ইন্ডিজ। বৃহৎ অর্থে, সাবেক ড্যানিশ ও স্প্যানিশ দ্বীপপুঞ্জের কিছু দ্বীপ সম্মিলিতভাবে আমেরিকান ওয়েস্ট ইন্ডিজ নামে পরিচিত যা সাম্প্রতিককালে পরিচিতি পাচ্ছে।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, একমাত্র ক্রিকেটটাই এরা একসাথে খেলে। ক্রিকেট ছাড়া এরা আর কোন কিছুই একসাথে করেনা। রাজনৈতিকভাবে তো আলাদাই, এমনকি অন্যান্য খেলাধুলাও এরা সবাই আলাদা দেশ হিসাবেই খেলে।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের একটি অঞ্চল যা দ্বীপ রাষ্ট্রসমূহ এবং তিনটি বড় দ্বীপপুঞ্জের পার্শ্ববর্তী জলের অন্তর্ভুক্ত: বৃহত্তর এন্টিলস, কম অ্যান্টিলিস এবং লুকায়ান দ্বীপপুঞ্জ।

এই অঞ্চলটি ফ্লোরিডা থেকে পশ্চিমাঞ্চলীয় উপসাগরীয় উপকূল বরাবর চলমান এলাকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর উপকূল জুড়ে মধ্য আমেরিকা এবং এরপর পূর্ব দিকে মেক্সিকান উপকূল বরাবর দক্ষিণে অবস্থিত এলাকা হিসেবে পরিচিত।

আদিবাসীরা ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম অধিবাসী। 1492 খ্রিস্টাব্দে, ক্রিস্টোফার কলম্বাস দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছানোর প্রথম ইউরোপিয়ান হয়ে ওঠে, যেখানে তিনি বিশ্বাস করেন যে ইতিহাসবিদরা বাহামা দ্বীপে প্রথমবারের মতো ফুট পায়। ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আমেরিকা ভ্রমণের প্রথম যাত্রার পর, ইউরোপীয়রা পূর্ব ইস্ট ইন্ডিয়া দক্ষিণ এশিয়ায় এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অঞ্চল থেকে পৃথক করার জন্য ওয়েস্ট ইন্ডিজ শব্দটি ব্যবহার করতে শুরু করে।

উত্তর আমেরিকার ফ্লোরিডা উপদ্বীপ এবং ইয়ুকাটান উপদ্বীপের মধ্যে দক্ষিণ আমেরিকার ভেনেজুয়েলার উত্তর উপকূলের মধ্যে অবস্থিত দ্বীপপুঞ্জের একটি গোষ্ঠী। মেক্সিকো উপসাগর, ক্যারিবিয়ান এবং আটলান্টিক মহাসাগর ভাগ। বাহামা, গ্রেট অ্যান্টিলিস এবং লেস্টার অ্যান্টিলিস দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত: বাহামা, কিউবা, জ্যামাইকা, হাইতি, ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র, বার্বাডোজ, ডোমিনিকা, সেন্ট লুসিয়া, সেন্ট ভিনসেন্ট এবং গ্রানাডিন, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো। এটি এন্ডিস পর্বতমালার সাথে সম্পর্কিত orogenic বেল্টের অন্তর্গত এবং আগ্নেয় সম্পর্কিত কার্যকলাপ রয়েছে। জলবায়ু উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বাণিজ্যিক বায়ু, গ্রীষ্মমন্ডলীয়, উপট্রোপিকীয় প্রভাবের অধীন। প্রায়ই একটি হারিকেন ঘটে। এটি প্রাকৃতিক প্রজাপতি যেমন প্রবাল প্রাচীর এবং গ্রীষ্মমন্ডলীয় গাছপালা হিসাবে আশীর্বাদযুক্ত হয়, এবং আখ, কফি এবং তামাক জন্য একটি উত্পাদনকারী স্থান হিসাবে বিখ্যাত নামটি বাহামা নদীর সান সালভাদর দ্বীপের ভুল বোঝাবুঝির কারণে ছিল, যেখানে কলম্বাস 149২ সালে ভারত হিসাবে আবির্ভূত হয়েছিল।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ/ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ মোট ১৩ টি দেশ নিয়ে গঠিত এগুলো খুবসহজে ছন্দ আকারে মনেরাখা যায় তাহল- বাহ!বার র্বাবা কিউবা,হাইতির জামাই ডো ডো,গ্রানাডার সেন্ট লুসিয়া ভিন কিটস এবং ত্রিনিদাদের লারা

নিচে তা ক্রমান্নয়ে দেয়া হল------------

  1. বাহামাস
  2. বারমুডা
  3. বার্বাডোজ
  4. কিউবা
  5. হাইতি
  6. জ্যামেইকা
  7. ডোমেনিকা
  8. ডোমেনিকান
  9. গ্রানাডা
  10. সেন্ট লুসিয়া
  11. সেন্ট ভিন্সেন্ট
  12. সেন্ট কিট্‌স
  13. ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো

ক্রিকেটীয় সংস্কৃতিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের গোড়াপত্তনের ইতিহাস অনেক পুরনো। ১৮৯০ সালের দিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দলের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। তখন তারা সফরকারী ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলের বিপক্ষে প্রথম মাঠে খেলতে নামে। ১৯২৬ সালে ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইম্পেরিয়াল ক্রিকেট কনফারেন্সে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ড বা ডব্লিউআইসিবি যোগদান করে। এরপরই তারা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম আন্তর্জাতিক খেলায় অংশগ্রহণ করে। এর দু’বছর পরই ১৯২৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দল চতুর্থ টেস্ট খেলুড়ে দলের মর্যাদা লাভ করে।

১৯২৮ সালে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেট দল; Image Source: twitter.com

চিরচেনা ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের সবচাইতে গৌরবময় সময় ধরা হয়ে থাকে গত শতকের সত্তরের দশকের মাঝামাঝি থেকে নব্বইয়ের দশকের প্রথমদিক পর্যন্ত। এই সময়টিতে দলটি টেস্ট ও একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে একচ্ছত্র প্রাধান্য বিরাজ করে গিয়েছে। পরবর্তী সময়েও বেশ উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেলেও ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজ’ ক্রিকেট দল ক্রিকেট বিশ্বে একটি শক্তিশালী নাম হিসেবেই সুপরিচিত হয়ে এসেছে। আর দলটির নামের সাথে কোনো প্রকার অবমূল্যায়ন না করে ক্রিকেট বিশ্বকে উপহার দিয়ে গিয়েছে অসংখ্য শক্তিশালী খেলোয়ার।

১৯৮০ সালের ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট টিমের একাংশ; Image Source: cricwizz.com

ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলটির সাথে যুক্ত হয়ে আছে অসংখ্য পরিচিত মুখ। স্যার গ্যারফিল্ড সোবার্স, ল্যান্স গিবস, গর্ডন গ্রীনিজ, জর্জ হ্যাডলি, ক্লাইভ লয়েড, ম্যালকম মার্শাল, অ্যান্ডি রবার্টস, আলভিন কালীচরণ, রোহন কানহাই, ফ্রাঙ্ক ওরেল, এভারটন উইকস, কার্টলি এমব্রোস, মাইকেল হোল্ডিং, জোয়েল গার্নার, স্যার ভিভ রিচার্ডসসহ আরও অনেকে। টেস্ট ক্রিকেটের এক ইনিংসে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের বর্তমান বিশ্বরেকর্ডধারী ব্রায়ান লারার নাম তো এখনও অনেক আন্তর্জাতিক বোলারদের স্বপ্নের মাঝে হানা দেয়।

ব্রায়ান লারা; Image Source: sportarchivestt.com

তবুও একদিনের আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টগুলোতে যেন আগের ছন্দে ফিরতে পারছিল না দলটি। ১৯৭৫ ও ১৯৭৯ সালে পরপর দুবার ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড কাপ জয়ের পর অনেক বছর যেন অধরাই রয়ে গেল কাপটি। ২০০৪ সালে আই সি সি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে এসে দেখা মিলল নতুন করে কোনো বড় টুর্নামেন্ট জয়ের স্বাদ। সেবার ফাইনালে প্রতিদ্বন্দ্বীপূর্ণ ম্যাচে ইংল্যান্ডকে ওভালের মাটিতে দুই উইকেটে পরাজিত করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথমবারের মতো ঘরে তুলে নেয় চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি।

১৯৭৫ সালে ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নদের এক ঝলক; Image Source: indiancricketstars.com

তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের সব চাইতে চমকপ্রদ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অন্তর্ভুক্ত হলো একদিনের ক্রিকেট খেলার সংক্ষিপ্ত রূপ ‘টি ২০’। ২০ ওভারের এই সংক্ষিপ্ত ক্রিকেট বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে  ফিরিয়ে আনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটারদেরকে। ‘পাওয়ার ক্রিকেট’ নামক শব্দের অবতারণ করে বেশ দাপটের সাথেই ক্রিকেট বিশ্বে পদার্পণ করে দলটি। চমৎকার ক্রীড়ানৈপুণ্য দেখিয়ে ২০১২ এবং ২০১৬ সালে দুবার আই সি সি টি ২০ ওয়ার্ল্ড কাপ জয় করে দলটি। শুধু কাপ জয়ই নয়, তা কীভাবে উদযাপন করতে হয় তারও এক সাক্ষর রেখে যায় কলকাতার মাটিতে। বিশ্ব অবাক হয়ে দেখে আর নাচতে থাকে গেইলের ‘গ্যাংনাম’ আর ব্রাভোর ‘চ্যাম্পিয়ন’ স্টাইলের সাথে।

২০১৬ সালে টি টোয়েন্টি জয়ী দলের উন্মাদনা; I

একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচের প্রথম তিনটিতেই ওয়ার্ল্ড কাপ ফাইনাল খেলা দলটি সবসময় অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং যথাযথ নিয়ম-শৃঙ্খলার অভাবের শিকার হচ্ছিল। এসব কারণে ছিটকে যেতে হয়েছিল অনেক উদীয়মান ক্রিকেটারকেও। বোর্ডের সাথে দলের খেলোয়াড়দের দ্বন্দ্ব তো লেগেই রয়েছে সবসময়। উপযুক্ত পারিশ্রমিক ও সুযোগ-সুবিধা খেলোয়াড়দের একান্ত আবশ্যক। প্রতিনিয়ত খেলোয়াড় পরিবর্তন, খেলোয়াড়দের শাস্তি এবং ঠিকভাবে বেতন না দেওয়ার অভিযোগে মূল দল পরিবর্তন করে সম্পূর্ণ নতুন দল নিয়ে খেলানোর অভিজ্ঞতা বারবারই হচ্ছিল এই দলটির। আর ফলাফল যে খুব একটা সুখকর হচ্ছিল তা কিন্তু নয়।

হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার আকুতি বারংবার। কিছুই যেন ঠিকভাবে যাচ্ছে না ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের মাঝে। কফিনের শেষ পেরেকটা ঠোকা হলো চলমান আই সি সি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি থেকে ছিটকে পড়ার ঘটনায়। তাই সার্বিক পরিবর্তন যেন সময়ের দাবি হিসেবে দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু শুধু দলের বা বোর্ডের নামের পরিবর্তন কতটা সুবাতাস বয়ে আনবে তা সময়ই বলে দেবে। তবে পুরো ক্রিকেট বিশ্ব অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে এই দলটির পুনরুত্থানের জন্য। শুধু টি টোয়েন্টিতেই নয়, অন্য ফরম্যাটগুলোতেও এই দলটিকে সমান তালে দেখতে চায় ক্রিকেটপ্রেমী দর্শকেরা।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

প্রজেক্ট প্রোফাইল: প্রবাসীদের হেল্পিং হ্যান্ড (Migrants' Helping Hand)

  প্রজেক্ট প্রোফাইল: প্রবাসীদের হেল্পিং হ্যান্ড (Migrants' Helping Hand)   উদ্যোক্তা: মো. তাকবীর হোসেন, সিইও, কেআর গ্লোবাল লিমিটেড ও গ্...