জার্মানির রাজধানী বার্লিন
জার্মানির রাজধানী এবং ইউরোপ মহাদেশের একটি ঐতিহাসিক শহর বার্লিন। জার্মানি প্রধান নগর কেন্দ্রে ৩৪ লক্ষেরও বেশি লোক বসবাস করে। এর আয়তন ৮৮৮ বর্গকিলোমিটার।
আয়তনের বিচারে বার্লিন প্যারিস শহরের প্রায় ৯ গুণ বড়। আজকের পোস্টে আলোচনা করা হবে জার্মানির বৃহত্তম শহর বার্লিন সম্পর্কে।
বার্লিন শুধু একটি শহরই নয়, এটি জার্মানির একটি রাজ্য। বার্লিন শহর এর মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে স্প্রি নদী। বলা যায় এই নদীর পাড়েই বার্লিন নগরের অবস্থান। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১১৫ ফুট উঁচুতে অবস্থিত।
বর্তমানে যেখানে বার্লিনের অবস্থান অতীতে সেখানে ছিল হ্রদ। তাই শহরটি বেশ নীচু। বার্লিনে খুব সহজেই অনেক হ্রদ চোখ পড়বে। সে কারণে এই শহরে ৯৬০টি ব্রিজ আছে। যা কিনা ভেনিস কিংবা আমস্টারডামের চেয়েও অনেক বেশি।
বার্লিনকে জার্মানির সবচেয়ে সবুজ শহর বলা হয়। কারণ শহরের প্রায় ৪৪ শতাংশ জায়গা লেক এবং গাছপালা দ্বারা পরিবেষ্টিত।
১৯৪৯ সালে থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বার্লিন দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। সে সময় শহরটি পূর্ব বার্লিন ও পশ্চিম বার্লিন নামে পরিচিত ছিল। পূর্ব বার্লিন ছিলো সমাজতান্ত্রিক এবং পশ্চিম বার্লিন ছিলো পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অধীনে ছিল।
১৯৬১ সালে পূর্ব জার্মান সরকার সেখানকার নাগরিকদের পশ্চিম বার্লিনে পালিয়ে যাওয়া ঠেকাতে দুই বার্লিনের মাঝে একটি দেয়াল তুলে দেয়। যা বার্লিন প্রাচীর নামে পরিচিত। ১৯৮৯ সালে প্রাচীর ভেঙে ফেলার পর দুই বার্লিন আবার একত্রিত হয়।
বার্লিন জার্মানি বৃহত্তম শিল্প নগরী। জার্মানির বাণিজ্যিক এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কেন্দ্রস্থল হলো বার্লিন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে জার্মানির অর্থনীতি পুনর্নির্মাণে বার্লিন ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছিল। মূলত পোশাকশিল্প, অধাতব শিল্প এবং চিনামাটির শিল্প যুদ্ধবিধ্বস্ত জার্মানির অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা করেছে।
বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে এই শহরের ইলেকট্রনিক পণ্য সামগ্রী বৃহৎ শিল্পে পরিণত হয়েছে।
বার্লিনের সংস্কৃতিঃ
বার্লিন শহরে বহু সংস্কৃতির সংমিশ্রণে রয়েছে। বিশ্বের ১৯০ টি দেশের প্রায় ৪ লক্ষ অধীবাসী বার্লিনে বাস করে। এদের মধ্যে তুরস্কের অধীবাসীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
বার্লিনে প্রায় 2 লক্ষ তুর্কি অধীবাসী রয়েছে। তাই বার্লিনকে তুরস্কের দ্বিতীয় রাজধানী বলা হয়। তুরস্কের বাইরে বার্লিনেই সবচেয়ে বড় তুর্কি সম্প্রদায় বসবাস করে।
আর এ কারণে বার্লিনে ইস্তাম্বুলের চেয়েও বেশি কাবাবের দোকান গড়ে উঠেছে। কাবাব তৈরীর উদ্দেশ্যে প্রতিদিন বার্লিনে ৬০ টন মাংস ব্যবহার করা হয়।
বার্লিনকে বিয়ারের শহর বললেও ভুল হবে না। বার্লিনের সাতটি বিশাল আঙ্গুর ক্ষেত রয়েছে। এখানে উৎপাদিত আঙ্গুর মূলত বিয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়।
বার্লিনে পঞ্চাশটি অ্যালকোহল জাতীয় পানীয় তৈরির কারখানা আছে। এছাড়া প্রতি বছর বার্লিনে তিনদিনব্যাপী বিয়ার ফেস্টিভাল হয়।
আগস্টের প্রথম সপ্তাহের ছুটির দিনে এই ফেস্টিভ্যালের আয়োজন করা হয়। ৯০ টি দেশের ২০০০-২৫০০ বিয়ার স্পেশালিস্ট ফেস্টিভালে অংশগ্রহণ করে।
২.২ কিলোমিটার দীর্ঘ ফেস্টিভ্যালের আয়োজন করে বার্লিন বিশ্বের দীর্ঘতম বিয়ার গার্ডেনের গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড অর্জন করেছে।
বার্লিনের সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার হলো ক্যারিওটস। এখানকার লোক প্রতিবছর প্রায় ৭ কোটি প্লেট ক্যারিযওটএস খায়। মজার ব্যাপার হলো বার্লিনের ৪০০ বছরের পুরনো একটি রেস্টুরেন্ট এখনো সক্রিয় আছে।
বার্লিন বিশ্বব্যাপি দেওয়াল চিত্রের জন্য বিখ্যাত। সে কারণে বার্লিন কে বলা হয় City Of Street Art।
চিত্রকলা প্রদর্শনের জন্য বার্লিন প্রাচীরের প্রায় দেড় কিলোমিটার অংশ সংরক্ষণ করা হয়েছে। একে East Side Gallery নামেও ডাকা হয়।
এবং এটি বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ Open Air আর্ট গ্যালারি। জায়গাটি বার্লিন ওয়াল মেমোরিয়াল নামে পরিচিত।
প্রতিবছর নতুন দেয়াল চিত্র আঁকার আগে পুরনো দেয়ালচিত্র সরাতে প্রায় ৩৫ মিলিয়ন ইউরো খরচ করতে হয়।
বার্লিনের যোগাযোগ ব্যবস্থাঃ
বার্লিনে রয়েছে বিশাল গণপরিবহন ব্যবস্থা। এখানকার যানবাহন ব্যবস্থা কে পাশাপাশি রাখলে তা প্রায় নয়বার পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে পারবে।
বার্লিনের পাতাল রেল ব্যবস্থায় ১৭৩টি স্টেশন আছে। বার্লিন সেন্ট্রাল স্টেশন ইউরোপের সবচেয়ে বড় ট্রেন স্টেশন।
বার্লিনে ১৮০ কিলোমিটারেরও বেশি নৌ-পরিবহন উপযোগী জলপথ রয়েছে। এখানে কায়াকিং বা নৌ ভ্রমণের মাধ্যমে পুরো শহরের সুন্দর দৃশ্য উপভোগ করা যায়।
১৮৪৮ সালে বার্লিনে ধূমপানের পরিমাণ অনেক বেড়ে গিয়েছিল। তখন রাস্তায় প্রচুর সিগারেটের উচ্ছিষ্টাংশ পাওয়া যেত। সে জন্য তখন থেকেই ঘরের বাইরে ধূমপান নিষিদ্ধ করা হয়।
কিন্তু বর্তমানেও বার্লিনের রাস্তাঘাটে ধূমপানের অভ্যাস কমেনি। এখনো প্রতিবছর বাড়ির রাস্তায় প্রায় ৩০ লাখ সিগারেটের ফিল্টার পাওয়া যায়।
জাদূঘরের শহর বার্লিনঃ
বার্লিনকে জাদুঘরের বললেও ভুল হবে না। এই শহরে ১৭৫টি জাদুঘর আছে। বার্লিনের একটি দ্বীপের নাম মিউজিয়াম আইল্যান্ড। এই দ্বীপে জার্মানির পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ জাদুঘর রয়েছে।
এর মধ্যে জার্মানির সবচেয়ে পুরনো জাদুঘর আলতেজ মিউজিয়াম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই জাদুঘরের দ্বীপটি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান।
শুধু তাই নয় বার্লিনে এই দ্বীপসহ মোট তিনটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান রয়েছে। ক্রুশিয়ান প্যালেস এবং বেশকটি পার্ক এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া বার্লিন শহরকে সিটি অফ ডিজাইন উপাধি দেওয়া হয়েছে।
জার্মানির রাজধানী বার্লিন শহর জার্মানির উত্তর-পূর্ব দিকে স্প্রী ( Spree) নদীর তীরে অবস্থিত ।
বার্লিনের আরও সৌন্দর্যঃ
বার্লিনের টিভি টাওয়ার জার্মানির সবচেয়ে উঁচু স্থাপনা। এই টাওয়ারের উচ্চতা প্রায় ১২০০ ফুট। এটি ইউরোপের তৃতীয় সর্বোচ্চ স্থাপনা। বার্লিন পৃথিবীর একমাত্র শহর যেখানে তিনটি সচল অপেরা হাউজ আছে। এছাড়া বার্লিনে আছে নয়টি দূর্গ।
বার্লিনের বাসিন্দারা এক জায়গায় দীর্ঘসময় বসবাস করে না। এই শহরে প্রতি ঘন্টায় ২০ জন লোক বাসা বদলায়।
অন্য যেকোনো দেশের বার্লিনে তুলনায় কোটিপতির সংখ্যা অনেক বেশি। এখানে প্রতি ৫০০০ জনে একজন কোটিপতি।
বার্লিনের এটিএম মেশিন থেকে আপনি টাকার বদলে সোনাও নিতে পারবেন। এখানকার এটিএম মেশিনে ২৫০ গ্রাম পর্যন্ত গোল্ডবার পাওয়া যায়।
জার্মানির তৎকালীন পার্লামেন্ট রাইখস্ট্যাগ আরেকটি দর্শনীয় স্থান। গম্বুজ ও কারুকার্য দিয়ে নির্মিত এই ভবনের ছাদ থেকে বার্লিনের মনমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করা যায়।
বার্লিন প্রাচীরের মতো অতীতের দুই জার্মানি সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য নির্মাণ করা হয় চেকপয়েন্ট চার্লি। বর্তমানে এটি একটি মিউজিয়াম এ পরিণত হয়েছে।
আশা করি বার্লিন দেশটি নিয়ে আপনারা বেশ ধারণা পেয়েছেন। যদি পোস্টটি পড়ে ভালো লাগে তাহলে অবশ্যই বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করবেন।
সমালোচিত জার্মানির রাজধানী বার্লিন
হামলার শিকার সেন্ট পিটার্সবুর্গ শহরের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে নিজেদের বিখ্যাত স্থাপত্য ব্রান্ডেনবুর্গ গেইটকে রাশিয়ার পতাকার রঙে আলোকিত না করে সমালোচিত হয়েছে জার্মানির রাজধানী বার্লিন। সাধারণত এ ধরনের সন্ত্রাসী হামলার পর নিজেদের স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যগুলো আক্রান্ত দেশের পতাকার রঙে আলোকিত করে সহমর্মিতা জানায় বিশ্বের প্রধান প্রধান শহরগুলো। সোমবার রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবুর্গের পাতাল রেলে চালানো বোমা হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত হন। এর আগে ফ্রান্স, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাসী হামলার পর বিশ্বের অন্যান্য প্রধান শহরগুলোর মতো বার্লিনও নিজেদের সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য ব্রান্ডেনবুর্গ গেইট আক্রান্ত দেশগুলোর পতাকার রঙে আলোকিত করে একাত্মতা প্রকাশ করেছিল।
কিন্তু সেন্ট পিটার্সবুর্গে হামলার পর বার্লিন কর্তৃপক্ষ ব্রান্ডেনবুর্গ গেইট রাশিয়ার পতাকার রঙে আলোকিত না করার সিদ্ধান্ত নেয়। সিদ্ধান্তের বিষয়ে বার্লিন শহর কর্তৃপক্ষের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, বার্লিনের মেয়র সিদ্ধান্ত নিয়েছেন শুধুমাত্র ‘অংশীদার শহরগুলো’ হামলার শিকার হলে তারা এ কাজ করবে, কিন্তু সেন্ট পিটার্সবুর্গ শহর তাদের ‘অংশীদার’ নয়। বার্লিন শহর কর্তৃপক্ষের এ সিদ্ধান্তে অনেকে ক্ষুব্ধ হয়েছেন, সমালোচকরা এটিকে একটি কেলেঙ্কারি বলে অভিহিত করেছেন। সমালোচকরা বলেছেন, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোতে সমকামীদের নৈশক্লাবে বন্দুকধারীর হামলায় ৪৯ জন নিহত হওয়ার পর ব্রান্ডেনবুর্গ গেইট রঙধনুর রঙে আলোকিত করা হয়েছিল, এছাড়া জেরুজালেমে হামলার পর ইসরায়েলি পতাকার রঙেও গেইটটি আলোকিত করা হয়েছিল, কিন্তু এই দুটি শহরের কোনোটিই বার্লিনের কথিত ‘অংশীদার’ শহর ছিল না।
জার্মান ব্রডকাস্টার ডয়েসে ভেলের রুশ বিভাগের প্রধান ইগনো মন্তেইফেল বলেছেন, ক্রেমলিনের সঙ্গে দ্বিমত থাকার পরও জার্মানি সরকার যখন সেন্ট পিটার্সবুর্গে নিহতদের জন্য শোক প্রকাশ করেছে তখন বার্লিন কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তে ওই নিহতদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয়েছে। তিনি বলেন, “রাশিয়ায় সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করার নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব আছে পশ্চিমা দেশগুলোর। ব্রান্ডেনবুর্গ গেইট রাশিয়ার পতাকার রঙে না রাঙানো ভুল, এটি একটি কেলেঙ্কারিও বটে।
” জার্মান সাপ্তাহিকী স্টার্নের প্রকাশক আন্দ্রেজ পেটজোল্ড এই টুইটে বার্লিনের নেতাদের ‘হীনমনা’ অভিহিত করেছেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর খবরে জানা গেছে, সন্ত্রাসী হামলার শিকারদের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে ইউরোপ দ্রুত তাদের বিশিষ্ট স্থাপনাগুলো আক্রান্ত দেশের পতাকার রঙে আলোকিত করে আসলেও সেন্ট পিটার্সবুর্গের হামলা ক্ষেত্রে তা করেনি তারা। মঙ্গলবার রাতে একমাত্র ইসরায়েল ছাড়া বিশ্বের আর কোনো দেশের বিশিষ্ট স্থাপনাগুলো রাশিয়ার পতাকার রঙে আলোকিত করা হয়নি।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন