বঙ্গ বা বাঙ্গালি শব্দের উৎপত্তির ইতিহাস
আমরা জাতিতে বাঙ্গালি হলেও এই ‘বাঙ্গালি’ নামকরণ কিভাবে হল সেই ব্যাপারে আমরা অনেকেই তেমন কিছুই জানি না। যেটা আসলে আমাদের জন্য লজ্জাকর। আমরা চাই আমাদের ইতিহাস ঠিকমত জানব। আমাদের অস্তিত্বের নামকরণের উৎপত্তি সম্পর্কে জানব। এই পর্বে জানব কিভাবে আমাদের অস্তিত্বের নামকরণ হল ‘বাঙ্গালি’।
বঙ্গ বা বাঙ্গালি শব্দের সঠিক ইতিহাস অনেকটা অজ্ঞাত। তবে বিভিন্ন গবেষকদের কাছ থেকে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। প্রাচীন যুগে এই অঞ্চলের সীমানা ও পরিধির পরিবর্তন ঘটত রাজশক্তির ক্ষমতা বৃদ্ধি ও হ্রাসের মাধ্যমে।
বঙ্গ শব্দ, দ্রাবিড়ীয় গোষ্টীর একটি উপজাতি বং বা বাং থেকে প্রথম উৎপত্তি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এই দ্রাবিড়ীয় গোষ্টী দক্ষিণ ভারত থেকে এসেছে বলে অনুমান করা হয়। অন্য একটি তত্ত্ব মতে, অস্ট্রালয়েড গোষ্টীর অস্ট্রীয় ভাষার শব্দ ‘ভাঙ্গা’ থেকে ‘বঙ্গা’ শব্দটি এসেছে বলে অনেকে মনে করেন। এই অস্ট্রালয়েড জাতীকে বঙ্গের প্রথম জাতী বলে ধারণা করা হয়। আর্যদের আগমনের পর বঙ্গ, অঙ্গ ও মগদ রাজ্য গঠিত হয় বর্তমান বাংলাসহ তার আশে পাশের এলাকা নিয়ে খ্রিষ্টপূর্ব এক হাজার বছর আগে।
মহান গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটলের শ্রেষ্ঠ ছাত্র মহাবীর আলেকজান্ডার ভারতবর্ষ আক্রমন করতে আসে। সেই যুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায় গ্রিক ঐতিহাসিকদের লিখায়। গ্রিক দার্শনিকদের সেই ঐতিহাসিক লেখায় ভারতবর্ষের বিভিন্ন দেশের কথা উল্লেখ আছে। সেই দেশগুলোর মধ্যে বঙ্গ-এর কথা উল্লেখ পাওয়া যায়। যা ঐতিহাসিক ভাবে ইতিহাসের পাতায় ‘বঙ্গ’ নামের প্রথম উল্লেখ।
খ্রিষ্টপূর্ব ৩২০ থেকে বঙ্গ ও তার পাশের অঞ্চলের রাজ্যগুলো বড় হয়ে থাকে। আর সেই সাথে এই পূর্ব ভারতের দক্ষিণাঞ্চলে বড় হওয়া রাজ্যের নাম দেন ‘বঙ্গরাজ্য’। এই নতুন বঙ্গরাজ্যের প্রথম রাজা শশাঙ্ক নিজেকে শক্তিশালি রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। যা বঙ্গরাজ্যের মর্যাদা প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর সাথে বঙ্গরাজ্যের জাতি নিজেদেরও মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। শশাঙ্কের ধারাবাহিকতায় পাল ও সেন শাসনামলে বাঙ্গালি জাতির ইতিহাসের যাত্রা অব্যাহত থাকে। খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০ সাল থেকেই বাঙ্গালিজাতি নিজেকে বিকশিত করতে শুরু করে।
‘বঙ্গ’ বা ‘বঙ্গালা’ থেকে ‘বাঙ্গালা’-র উৎপত্তি
মোগল আমলে বঙ্গকে ‘সুবা বাঙ্গালা’ নামে ডাকা হত। এই বাঙ্গালার আদি নাম ছিল বঙ্গ যা মোগল আমলে আল যোগে ‘বাঙ্গালা’ ডাকা হতে থাকে বলে অভিমত দিয়েছেন আবুল ফজল। এই ‘আল’ যোগের কারন হিসেবে তিনি বলেন, প্রাচীন কালে এই এলাকার মানুষেরা দশ থেকে বিশ গজ উচু এক প্রকার ‘আল’(বাধ) নির্মাণ করতেন। আর সেই ‘আল’ যোগ করে বঙ্গ থেকে বাঙ্গাল বা বাঙ্গালাহ হয়েছে। যদিও তার এই মত অনেকে স্বীকার করে নেয়নি। এই দিকে আবার রমেশ মজুমদার বলেন, প্রাচীনকালে ‘বঙ্গ’ ও ‘বঙ্গাল’ আলাদা দুটিদেশ ছিল। ‘বঙ্গাল’ নামক দেশ হতে ‘বাংলা’ নামের উৎপত্তি হয়। এই মতটাও অনেকে গ্রহণ করেননি। তাই বলা যায় বঙ্গ থেকে না বঙ্গালা থেকে বাংলা নামের উৎপত্তি হয়েছে তা অনিশ্চিত। তবে তাদের দুই জনের মত থেকে আবুল ফজলের মত অনেকটা শক্তিশালি সেই সময়কার প্রেক্ষাপটে।
মোগল পূর্ব শাসনামল
এছাড়া মোগলদের পূর্ব আমলেও ‘বাঙ্গালা’ নামের কোন রাজ্যের উল্লেখ পাওয়া যায় না। তবে সেখানে ‘বঙ্গ’ নামের রাজ্যের কথা উল্লেখ পাওয়া যায়, সিরাজ-ই মিনহাজের বর্ণনায়। তবে তিনি বঙ্গের সাথে সমতট উল্লেখ করে বলেন, ‘বঙ্গ সমতট’ নামে অবহিত করেন। তার পরবর্তি সময়ে ইতিহাসবিদ জিয়া-উদ্দিন-বারনী সর্ব প্রথম ‘বাঙ্গালা’ শব্দের ব্যবহার করেন। পরবর্তিতে সুলতান শামস উদ্দিন ইলিয়াস শাহকে ‘শাহ-ই-বাঙ্গাল’ উপাধিতে ভূষিত করেন। সুলতান ইলিয়াস শাহের আমলে ‘বাঙ্গাল’ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। এখানে আমরা দেখতে পাই মুসলিম পূর্বযুগে কোথাও বাঙ্গালা শব্দের ব্যাবহার হয়নি। এই ‘বাঙ্গালা’ শব্দটি মুসলিম যুগ ইলিয়াস শাহের আমলে প্রতিষ্ঠিত হয়।
ইউরোপীয় যুগ
পর্তুগীজ বনিকেরা এই মোগলদের কাছ উৎপত্তি নাম ‘বাঙ্গালা’ কে ‘বেঙ্গালা’ নাম দেয়। ইংরেজরা এই ‘বেঙ্গালা’ শব্দকে ‘বেঙ্গল’ নামে ডাকতে থাকে। যা পরবর্তিতে এই ‘বেঙ্গল’ নামেই অধিক ব্যবহৃত হতে থাকে।
আমরা ১৯৪৭ সালে ‘বেঙ্গল’ কে ‘বঙ্গ’ নামে ডাকতে থাকি। এই বঙ্গ অঞ্চল দুই ভাগ হয়ে নাম হয় পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ। ১৯৭১ সালে পূর্ববঙ্গ হয়ে যায় বাংলাদেশ। আর পুরো বঙ্গের জাতিরা ‘বাঙ্গালা’ সাথে বিশেষন যোগে হয়ে যায় ‘বাঙ্গালী’।
এভাবেই দ্রাবিড়ীয় উপজাতি বং বা বাং-দের থেকে আজকের বাংলা ও বাঙ্গালী জাতির ইতিহাস তৈরি হয়েছে হাজার হাজার বছরের ব্যবধানে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন